বৃহস্পতিবার | ২৪শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

আমিও টিভি’র মালিক

প্রকাশিত :
শামিমুল হক : আমিও টিভি’র মালিক। আমি নিজেই সাংবাদিক। সম্পাদক। নিজেই মাঠ চষে বেড়াই। আমি আবার সাংবাদিক নিয়োগও দেই। যারা আমাকে টাকা এনে দিতে পারবে তাদেরই আমি সাংবাদিক কার্ড দেই। এভাবে উপজেলাজুড়ে সাংবাদিকের জন্ম দেই আমি। যারা আমার কার্ড নিয়ে ছুটে যায় মাঠে- ময়দানে। মক্কেল ধরে কাবু করে টাকা নিয়ে আসে। আমার সাংবাদিকরা নিজেরাই বোম কিনে আনে। নিজেরাই প্রাইভেটকার নিয়ে ছুটে চলে উপজেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আমার নিজের টিভি থাকায় প্রশাসনের কর্তারাও আমাকে সমিহ করেন। সম্মান করেন।
ইউএনও, ওসি ওরা আমার বন্ধু। কি মজা। আমাকে দেখে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। আর আমার টিভিতে ওইসব রিপোর্টই দেখানো হয় যেখান থেকে মাল পাওয়া গেছে। মানে টাকা পাওয়া গেছে। অনলাইন টিভি’র মালিকারা এভাবেই বুক ফুলিয়ে নিজেদের পরিচয় দেন। দেশের প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম থেকেও এখন অনলাইন টিভি প্রচার হচ্ছে। আবার ফেসবুকে বিজ্ঞাপনও দেখা যায় মাত্র ৯শ’ টাকা হলেই আপনি হতে পারেন অনলাইন টিভি’র মালিক। ক’দিন ধরে ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার অনলাইন টিভি’র তালিকা। যেখানে ২৫টি টিভি’র নাম দেয়া হয়েছে। আশ্চর্য! যেখানে মানুষ এখন ঘরে রাখা টিভি দেখারই সময় পায়না।
সেখানে অনলাইন টিভি দেখার সময় কোথায়? তারপরও নবীনগরে ২৫টি টিভি চলছে। এসব টিভি’র নাম ভাঙিয়ে উপজেলাজুড়ে কথিত সাংবাদিকরা ছুটছে। তাদের কর্ম সেরে আবার ফিরছে। গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চলছে। মানুষকে জানান দিচ্ছে তিনি কত বড় সাংবাদিক। একনজরে নবীনগরের সেই তালিকায় একটু দেখে আসি অনলাইন টিভি’র নামগুলোÑ নবীনগর টিভি, নবীনগর ২৪ টিভি, নবীনগর নিউজ টিভি, নবীনগর নিউজ, নবীনগর তিতাস টিভি, নবীনগর প্রাইম টিভি, নবীনগর বয়েস টিভি, চ্যানেল নবীনগর, আই নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিদিন টিভি, গ্রাম বাংলা টিভি, নবীনগরের আলো, জাগো নবীনগর টিভি, টাইম বাংলা টিভি, তিতাস নিউজ, এনআর টিভি, নবীনগর ৭১ টিভি, নূরনগর টিভি, ইউপিসি টিভি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৪ টিভি, আই টিভি, সি টিভি, মলয়া টিভি, টিভি ওয়ান, আয়েশা টিভি ও এএম টিভি। দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকার নবীনগর প্রতিনিধির বক্তব্য হলো- এইসব টিভি’র বেশির ভাগ লোকজন নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
নিরীহ মানুষকে এরা হয়রানি করছে। চাঁদাবাজি করে গ্রামের মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। এদের হাত থেকে আমাদের বাঁচান। এই যদি হয়, দেশের একটি উপজেলার চিত্র তাহলে সারা দেশের চিত্র কিÑ তা অনুমান করা যায়। আর এমন অনলাইন টিভি’র কথিত সাংবাদিকই হয়তো সারা দেশে রয়েছে কয়েক লাখ। যারা অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত। আসল কথা হলো- অনলাইন টিভি চালানোর কোনো বৈধতা নেই দেশে। যা চলছে সবই অবৈধ। আর এসব দেখার কেউ নেই। ফলে ওরা বুক ফুলিয়ে চলছে। এতো গেল একটি উপজেলার কথা। এবার আশা যাক রাজধানী ঢাকায়। বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমন সম্প্রতি ফেসবুকে এক লেখায় উত্তরার ভুয়া সাংবাদিকের নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। তার লেখা পড়ে চোখ চড়কগাছ। খোদ রাজধানীতে যদি এমন হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমনের লেখা থেকে অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো-
উত্তরায় একশ্রেণির সাংবাদিক দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বিমানবন্দর থেকে উত্তরা পর্যন্ত পা ফেললে তাণ্ডব সৃষ্টিকারী কথিত সাংবাদিকদের অভাব তো দেখি না। ভুয়া সাংবাদিক, ফেসবুক সাংবাদিক, সোর্স সাংবাদিক, দলবাজ সাংবাদিক, টোয়েন্টিফোর ডটকম মার্কার সাংবাদিক-সম্পাদক, আইপি টিভি, ফেসবুক লাইভ সাংবাদিক-আরো কত শত পদ-পদবির সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যে উত্তরাবাসীর জীবন অতিষ্ঠ। কোথাও দু’লাইন না লিখেও শুধু আইডি কার্ড কিনেই রাতারাতি সাংবাদিক বনেছেন কেউ কেউ। সরাসরি বারবণিতা থেকে সাংবাদিক সেজেছেন আবার কেউবা বারবণিতা কাম সাংবাদিক হয়ে জীবন সংসার চালাচ্ছেন। ভুয়াবাজির মাধ্যমে সাংবাদিক পরিচয়ে জীবিকা নির্বাহের পরও কী পেশাটির প্রতি এতটুকু মমত্ব জাগে না?
সচেতন মানুষজন মাঝে-মধ্যেই বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন- র‌্যাব’র হাতে ভুয়া র‌্যাব ধরা পড়ে, ডিবি’র হাত থেকে ভুয়া ডিবি’র গ্রুপও নিস্তার পায় না। কিন্তু ভুয়া সাংবাদিক, সোর্স সাংবাদিক, প্রতারক সাংবাদিক দমনে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বটা কি? উত্তরাজুড়ে ডজন ডজন প্রেস ক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাবসহ নানা নামের সাংবাদিক সংগঠন গজিয়ে উঠেছে। খোদ উত্তরা থেকেই বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়, আছে আইপি টিভি চ্যানেলও। সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমন জানালেন, শুধু উত্তরাতেই ১৯টি প্রেসক্লাব রয়েছে। তার এ কথা শুনে ‘থ’ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। রিমন তার লেখায় কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতি তার এসব প্রশ্ন অমূলক নয় বলেই মনে কর।
লেখক : সাংবাদিক।
আজকের সর্বশেষ সব খবর