রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

বানিয়াচংয়ে হাওড়ে সোনালী ধান, কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশিত :

আব্দাল মিয়া, বানিয়াচং থেকে : মাইলের পর মাইলজুড়ে কৃষি জমি। সেই জমিতে ফলানো হয়েছে বোরো ধান। বৈশাখের শুরু থেকেই সেই ধান সোনালী রং ধারণ করছে। এতে বিস্তৃত হাওর এলাকা হয়ে উঠেছে সোনালী রংয়ের আভা। বিকেলের হালকা বাতাসে কিংবা সকালের সোনালী রোদে দুলছে ধানের সোনালি শিষ। আর সেই শিষ দুলানো সোনালী ধান বৈশাখ শুরু হতেই চলছে কাটার মহোৎসব। এমনিভাবে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের প্রতিটি হাওরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকরা ধান কাটছেন। প্রখর রোদ কিংবা বৃষ্টির পূর্ভাবাস উপেক্ষা করে ধান কাটছেন কৃষকেরা।

সেই সোনালি ধান মাথায় কিংবা কাধে বয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। অন্যদিকে চলছে মাড়াইয়ের কাজ । কৃষাণিরা মনের আনন্দে মাড়াই করা ধান বাতাসে ওড়াচ্ছেন। খলাতেই শুকিয়ে নিচ্ছেন সেই স্বপ্নের ধান। বিকেলের শান্ত রোদে শুকনো ধান মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষাণিরা। ধান গোলায় ভরে তবেই স্বস্তি। হাওরে ধান কাটার এ উৎসবে শুধু কৃষাণ-কৃষাণি নন, বাড়ির সব বয়সী মানুষই যোগ দেন তাতে । হাওরে এ যেন এক অন্য রকম উৎসব চলে বৈশাখমাস জুড়ে। ফসল গোলায় তোলার এ উৎসবের কাছে প্রখর রোদ, বৈশাখের ঝড়-বৃষ্টি সবই যেন তুচ্ছ কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের। ধানের সবুজ শিষের রং যখন লালচে হতে শুরু করে, তখন কৃষকের মনের রং বদলায়।

চোখ-মুখ খুশিতে ভরে ওঠে। প্রস্তুতি শুরু করেন ধান কাটার। বাড়ির পাশে কিংবা হাওরের কোনো জায়গায় তৈরি করা হয় খলা (ধান কেটে মাড়াই করার স্থান)। খলা তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখেন কিষাণিরা। নতুন ধানের সঙ্গে মনের আনন্দে একটি মাস এ খলাতেই বেশি সময় কাটান বাড়ির গৃহিণীরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার বোরো মৌসুমে ৩৪ হাজার ৮শ’ ৩৫ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ নির্ধারণ করা হলেও লক্ষ্য মাত্রার চেয়েও ১০০ হেক্টর বেশি চাষাবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে এবার প্রতি কৃষক ২কেজি করে মোট ৭হাজার ৫শ জন কৃষকের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

শনিবার (১৭এপ্রিল) চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু কড়া রোদে উপজেলার হাওর এলাকার চেনা এ রূপের খন্ডচিত্রে দেখা যায় পূবালী বাতাসে ধান ক্ষেতে বাতাসে ধানগাছগুলো দুল খাচ্ছে। ধানগাছের সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝে আধা পাকা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। কতই না কৃষকের মনে আনন্দ বিরাজ করছে। সেই সময় ফসলের মাঠেই কথা হচ্ছিল মধ্য যাত্রাপাশার কৃষক আব্দুল হাই মিয়ার সাথে। কবে নাগাদ পুরোপুরি ধান কাটা শুরু হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সপ্তাহ দুই সপ্তাহ পরে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। তবে এখন কিছু কিছু আটাশ জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। করোনা ও রোজার মধ্যে ধান কাটার বেশ ধুম পড়বে। এ ব্যস্ততা চলবে বৈশাখমাস জুড়ে। এবার বৈশাখ মাসে রোজা হওয়ায় পুরো এক মাসতো কষ্ট করতে হবে? তিনি মুচকি হেসে বলেন, আমরার লাগি ইতা কোনো কষ্ট না।

এই ধান ঘরে তুলতে পারলেইতো সারা বছর সুখে থাকা যায়। মূলত প্রকৃতির ওপরই ভরসা করে তাঁরা। গত বছরের ন্যায় আগাম বন্যা নিয়ে শঙ্কাও তাঁদের। বিগত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধান দ্রুত বাহির হচ্ছে। উপজেলা জুড়ে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমকে ঘিরে উৎসবের শেষ নেই। সেই দিন আসছে দিনভর পরিশ্রম করে ক্লান্ত-শ্রান্ত কিষান-কিষাণিরা রাতে বাউলগান, যাত্রাগানসহ নানা লোকগানের আসর বসান। এভাবে বিনোদনের মাধ্যমে তাঁরা মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। এরপর মধ্যরাতে ঘুমাতে যান এবং ভোরে জেগে উঠে আবার ফসল তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। প্রতি বছর সাত-আট দিন আগে হাওরে অল্প অল্প করে জমিতে ধান পেঁকেছে। গতবারের চেয়েও এবার বেশি ফলন হবে বলে আশা করেন কৃষকরা। ফসল ঘরে তোলার পর নতুন চালের পিঠা বানানো হবে। সে সময় আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত করে একসঙ্গে ধান তোলার উৎসব হবে বলে তারা জানান।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে উপজেলার হাওর পাড়ের মন্দরী গ্রামে সরজমিনে গিয়ে হাওর এলাকার চিরচেনা এ রূপের খণ্ডচিত্র চোখে পড়ে। খলায় পূবালী বাতাসে ধান ওড়াতে থাকা কৃষাণি ছাকিয়া বেগমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, তিন-চার দিন ধরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। এ ব্যস্ততা চলবে বৈশাখমাস জুড়ে। পাশে থাকা জরিনার কপাল থেকে ঘাম ঝরছিল। ‘পুরো এক মাস কি করে এত কষ্ট করবেন?’—এমন প্রশ্নে তিনি মুচকি হেসে বলেন, “আমরার লাগি ইতা কোনো কষ্ট নায়। এই ধান ঘরও তুলতে পারলেইতো সারা বছর সুখে থাকা যায়”। এ সময় কাধে ধানের বোঝা নিয়ে আসেন কয়েকজন কৃষক। কাধ থেকে ধান নামাতে নামাতে শ্রমিক ইছাক মিয়া বলেন, ‘ইবার ধান ভালা অইছে বা। দিনের ভাবও (আবহাওয়া) ভালা। আমরার একটা মাস পাইলেই অয়।’ পাশ থেকে কৃষক হাসিদ মিয়া বলেন, ‘এক মাস না, ঠিকমতো ১৫ দিন অইলেই ধান তুলি লিতাম পারমু। আর এক মাস অইলেত খুবই ভালা ওই”। কৃষকরা জানান, বানিয়াচংয়ের চারটি বড় ধানি হাওরগুলোতে প্রতিটি ইউনিয়নের কৃষকদের জমি আছে। উপজেলার একমাত্র ফসল হলো বোরো ধান।

এ ধানের ওপরই তাঁদের সবকিছু নির্ভর করে। ঘরের খাওয়া-দাওয়া, বিয়ে-শাদি, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, আনুষঙ্গিক ব্যয় সবকিছুই বোরো ফসল থেকে আসে। কোনো কারণে ফসল গোলায় না উঠলে কৃষক পরিবারের দুঃখের আর সীমা থাকে না। তবে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। বানিয়াচং উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক তরঙ্গ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এ মৌসুমে ৩৪ হাজার ৮শ’ ৩৫ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ নির্ধারণ করা হলেও লক্ষ্য মাত্রার চেয়েও ১০০ হেক্টর বেশি হয়ে ৩৫ হাজার ৮শ ৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে এবার ৭হাজার ৫শ জন কৃষকের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। করোনার মধ্যে গত বছরের চেয়ে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে নানান জাতের ধান প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫ মেট্রিকটনেরও বেশি ধান তুলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আজকের সর্বশেষ সব খবর