শুক্রবার | ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ফলস ম্যাংগোস্টিন বা ডেফল’ এখন বিলুপ্তির পথে

প্রকাশিত :

আব্দাল মিয়া : আজকাল ডেফল অনেকের কাছেই অপরিচিত। চাকমা ভাষায় ডেফল, ডাম্বেল, ডেমগোলা এবং গারো ভাষায় আরুয়াক নামে সুপরিচিত। তবে সহজলভ্যের কারণে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং মহেশখালীতে ডেফল বেশ পরিচিত। বৃহত্তর সিলেটে টক বা ডাল রান্নায় এই ফল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। স্থানীয় মানুষ নানাভাবে এর ব্যবহার করেন। অঞ্চলভেদে এ ফলের একাধিক নাম থাকলেও ইংরেজিতে ফলস ম্যাংগোস্টিন বা ইয়েলো ম্যাংগোস্টিন নামে পরিচিত।

আমাদের দেশে বানিজ্যিকভাবে কোথাও ডেফল চাষাবাদ করা হয় না। ভাদ্রকালে কিছু সৌখিন মানুষ ডেফল গাছ লাগিয়ে থাকেন। ডেফল গাছ সাধারণত বনে জঙ্গলে, ঝােপ ঝাড়ে, অগভীর বন, টিলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে, বড় হয়, ফল হয় এবং বিস্তার ঘটে। শুধু ডেফলই নয়, আমাদের নিজস্ব ফলগুলো নিয়ে উন্নততর কোনো গবেষণা হয় না বললেই চলে। তাই ভিনদেশি ফলের চাকচিক্য আর স্বাদের তোপে আমাদের ফলগুলো বাজারমুখী হওয়ার সুযোগই পায় না। অথচ বিদেশি অনেক ফল থেকে তুলনামূলকভাবে আমাদের ফলগুলো বেশি পুষ্টিকর। ডেফলের পাতা উজ্জ্বল সবুজ, চকচকে, লম্বাটে বল্লমাকার, কিনার খাঁজকাটা ও অগ্রভাগ সূঁচালো, ২০-২৪ সেমি লম্বা। এর ফুল সাদা, ১৯ মিমি ব্যাসবিশিষ্ট। ফুল ফোটে মার্চ থেকে মে মাসে। ফল মাঝারি আকারের আপেলের সমান; ৮-১০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফলটি মসৃণ, অগ্রভাগ সূঁচালো, এবং কিছুটা বাঁকানো; কাচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে গাঢ় হলুদ রঙের হয়। শীতকালে গাছে যখন পাতা ঝরে যায়, তখন ফল পাকতে শুরু করে।

এই ফলের শাঁস সুগন্ধযুক্ত ও রসালো। ভেতরে এক বা একাধিক বীজ থাকে। ডেফল খেতে এতই টক যে, প্রাচীন বচনেও তার সরব উপস্থিতি রয়েছে যথা “ডেওয়া ডেফল, অতি চুকা নারিকেল” অর্থাৎ ডেফল ডেওয়া খাওয়ার পর মিষ্টি নারিকেলও টক লাগে। ডেফল, বহু প্রাচীন এবং বাংলাদেশে অপ্রচলিত ফলের তালিকায় তার স্থান। গাছটির আদি নিবাস মালয়েশিয়ায়। আবার অনেকেই উত্তর ভারতে এর আদিস্থান দাবি করেন। একসময় বাংলাদেশের সিলেট, ময়মনসিংহ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে ডেফল গাছ ব্যাপকভাবে দেখা যেত। বর্তমানে জঙ্গলের ফল গাছ নামে খ্যাত ডেফল শুধুমাত্র সিলেট ও পার্বত্য এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ডেফল গাছের পরিমানও আশংকাতীত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে সহজেই এই গাছ জন্মে থাকে। রােদেলা ও ছায়াময় উভয় জায়গাতেই এই গাছের বেড়ে উঠা বড়ই স্বাচ্ছন্দময়।

এ গাছের অন্যতম বড় একটি গুণ হলাে অনাবৃষ্টি তথা খড়াসহনশীল গাছ। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই (দক্ষিণ চীন, ভারতীয় উপমহাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বােডিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম) ডেফল চাষ করা হয়। ডেফল সরাসরি খাওয়া যায়না,খাওয়ার উপযোগী করতে হয়। পরে মাছ-মাংসের সাথে সাতকরার (হাতকরা) মতো খাওয়া যায়। একসময় ডেফল তেঁতুলের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। পাকা ডেফল অত্যন্ত টক। এটি দিয়ে জ্যাম, জেলি, আচার, জুস, সস, চাটনি, টক ডাল এবং তরকারি তৈরি করা হয়। ফলের ভেতর চার-পাঁচটি দানা থাকে। দানার সাথে রসালাে ভক্ষণ অংশ থাকে, যা চুষে খাওয়া যায়। কাঁচা ফল খেলে দাঁতে হলদেটে কষ লেগে যায়। সিলেটের বাজারে কাঁচা ডেফল বিক্রি হয়।

সিলেটে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার ট্যাঙ্গা বা টক রান্নায় এটি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ডাল ও অন্যান্য নানাবিধ তরকারি রান্নায়ও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাচা ডেফল ফালি ফালি করে কেটে শুকিয়ে আমসুল তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে লবন, মরিচের গুড়া মিশিয়ে মুখরােচক লােভনীয় চাটনি তৈরি হয়। জঙ্গলে বানর ও অন্যান্য পশু-পাখিরাও ডেফল খেয়ে থাকে। ডেফল গাছে পার্পল-ম্যাঙ্গোস্টিনের কলম দেওয়া যায়। এভাবে একই গাছে ডেফল ও ম্যাঙ্গোস্টিন উভয় ফল উৎপাদন করা যায়। শুকনাে ডেফল ফলের নির্যাস থেকে জলরং তৈরি করা হয়। ডেফলের ভেষজ গুণাগুণও রয়েছে। ডেফল থেকে এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ সংগ্রহ করা যায়। যার মধ্যে এন্টিবায়ােটিক এবং এন্টি-ম্যালেরিয়াল গুণ আছে বলে ধারণা করা হয়। ভেষজ চিকিৎসায় এর অনেক ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ফল কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রপ্রদাহ সারাতে বেশ কার্যকর।

ফলের রস জ্যাম এবং প্রাকৃতিক ভিনেগার তৈরিতে কাজে লাগে। বছরে ২/৩টি ডেফল খেলে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে এবং রক্তনালীর ছোট-খাটো ব্লক পরিষ্কার হয়ে যায়। ডেফলে প্রচুর পুষ্টি উপাদান রয়েছে। মুখের রুচি বাড়াতে এবং জ্বরের জন্য বেশ কার্যকরী। ভিটামিন সি তে পূর্ণ এই ফলটি সর্দিজ্বর ও ঠান্ডা প্রশমনে বেশ উপকারী। আগেকার দিনে মানুষ জ্বর হলেই ডেফল খোঁজাখুঁজি করতে বের হয়ে যেত। এছাড়া এটি অরুচি দূর করতে সহায়তা করে। পরিপক্ক ফল বায়ুনাশক ও পিত্তদোষ কমায়। কাঁচা ফল থেতলিয়ে গরম পানির সাথে খেলে দান্ত কমে যায় এবং মেদ ভুড়ি কমায়।

এই জাতীয় আরো খবর

আজকের সর্বশেষ সব খবর