বুধবার | ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ঘোড়ার সওয়ারী চাপাইনবাবগঞ্জের সোনিয়ার গল্প ও আমাদের সমাজ

প্রকাশিত :

আবুল কালাম আজাদ : চাপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বকলা গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান কিশোরী সোনিয়া। স্থানীয় ভিটেবাড়ি সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাবা অন্যের জমি চাষ করে এবং দিনমজুরী করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাবাও একসময় ঘোড়ার সওয়ারী ছিলেন। মেয়ের ইচচ্ছাতে বাবাই তাকে ঘোড়ার সওয়ারী হিসেবে তৈরী করেছেন। এমন অবস্থা থেকে বেড়ে ওঠা কিশোরী সোনিয়া এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশজুড়ে। সারা দেশে ঘোড়দৌড় খেলায় এখন উজ্জ্বল মুখ ১০ বছর বয়সী সোনিয়া। হাজারো পুরুষ খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে নিচ্ছে সে। খেলার মাঠে হাজারো দর্শক মাতিয়ে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে খুব অল্পদিনেই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। তাই খেলার মাঠে দর্শকের চোখ এখন কেবল তার দিকেই।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম তাই, সওয়ারিই হয়ে উঠেছে সংসারের সম্বল।
তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকেই এলাকায় ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতায় ঘোড়ার সওয়ারী হয় সে। মুলত বাবার সওয়ারী দেখেই সে ধীরে ধীরে সওয়ারী হয়ে যায়। কারণ এতে টাকা পাওয়া যায়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে তাকেও পরিবার সওয়ারী হিসেবে দিয়ে দেয়। প্রায় চার বছর ধরে সোনিয়া ঘোড়ার সওয়ারী হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি সে লেখাপড়া করছে। চাপাইনবাবগঞ্জের গন্ডি পেরিয়ে বগুড়া, নওগা. কুড়িগ্রাম, জামালপুর, রাজশাহী, নাটোরসহ বিভিন্ন জায়গায় সে সওয়ারী হিসেবেকাজ করেছে। পেয়েছে অনেক পুরস্কার।

মোটর সাইকেল,ফ্রিজ, টিভি, নগদ অর্থ থেকে শুরু করে অসংখ্য পুরস্কার সে পেয়েছে। কিন্তু তার ভাগ্যে আসলে পুরস্কার খুম কমই জুটে। কারণ সে সওয়ারী হিসেবে কাজ করে। বিনিময়ে পায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। যা দিয়ে তার ৪ বোন ও এক ভাই নিয়ে পরিবারের সংসারে সহযোগিতা করে।
১০ বছরের কিশোরী সোনিয়ার ঘোড়াদৌড়ের কয়েকটি ছবি শুক্রবার সন্ধা থেকে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। শুক্রবার চুনারুঘাট উপজেলার শাইলগাছে অনুষ্ঠিত ঘৌড়দৌড় প্রতিযোগিতায় ১০০ ঘোড়াকে টপকিযে সে চ্যাম্পিয়ন। তখণ মাছে ছিল ১৫ থেকে ২০ হাজার দর্শক। কয়েকটি রাউন্ডেই সে সকল ঘোড়াকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে বার বার।

যদিও মাঠে দর্শক সামাল দিতে গিয়ে আয়োজকরা সেমিফাইনাল না দিয়েই ফাইনাল খেলা দিয়ে আয়োজন সমাপ্ত করেন। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া কিশোরীর ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে শুরু হয় নানা আলোচনা সমালোচনা। একজন নারী হিসেবে তাকে অধিকাংশ মানুষ অভিনন্দন জানায় এবং তার প্রশংসায় ভরে তুলেন ফেসবুক। তারপরও তার ঘোড়ার সওয়ারী হওয়া নিয়ে এবং কেউ কেউ নারীদের বিশেষ করে কিশোরী মেয়েকে দিয়ে ঘোড়ার সওয়ারী করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে ভাল চোখে দেখেছেন। শুক্রবার সন্ধা থেকে গতকাল শনিবার দিনভর ফেসবুকে সোনিয়ার এ সওয়ারী নিয়ে দেশে বিদেশের ফেসবুক ইউজাররা নানা

মত প্রকাশ করেছেন। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে তাকে অনুসরণ করতে অনেকেই বলেছেন, আবার অনেকেই বলেছেন, নারীরা কোনকালেই অবলা ছিলনা, এটাই তার প্রমাণ। কেউ কেউ ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে বলেছেন, এটি ভাল হয়নি। নারীকে দিয়ে ঘোড়ার সওয়ারী হওয়া নিয়ে তারা সমালোচনা করেছেন। একজন তো লিখেছেন এটি কেয়ামতের আলামত। তবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সচেতন মহলের অনেক ফেবু ইউজার। এতসব আলোচনা আর সমালোচনার মধ্যে আবার কেউ কেউ বলেছেন এটি শিশু¤্রম। কিশোরী মেয়েকে দিয়ে এমন কাজ থেকে বিরত রাখার দাবী জানিয়েছেন তারা। কেউ কেউ প্রশাসনকে এ বিষয়ে নজর দেওয়ারও দাবী জানিয়েছেন।

 

ছবি : ঘোড়া সওয়ারি সোনিয়া।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা হচ্ছে ঘোড়ার দৌড়। অতি প্রাচীনকালে থেকে ঘোড়াকে পন্য পরিবহন, হালচাষ থেকে শুরু করে নানা কাজে লাগানো হত। সে সময় থেকেই মানুষের বিনোদন দিতে ঘোড়ার দৌড়ের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে জমিদাররা। কালে কালে আজ তা বিলুপ্তির পথে। তারপরও মাঝে মাঝে গ্রামীণ এলাকার এমন আয়োজন হলে মানুষ হুমরি খেয়ে পড়ে এ ঘোড়ার দৌড় দেখতে। এরই মধ্যে ঘোড়ার দৌড়ে সওয়ারী হিসেবে ছোট ছেলেদের থেকে এখন মেয়েরাও এগিয়ে এসেছে। দীর্ঘকাল থেকে এসব ঘোড়ার দৌড়ে অংশ নিয়েছে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা।

কিন্তু আজ সেখানে মেয়েদের অংশ গ্রহন প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু আজকাল ফেসবুকসহ সামাজিক বিভিনন্ যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তা সহজেই মানুষের কাছে পৌছে যাচ্ছে। আর এতে সস্তা আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। সেখানে যে যার মতো করে মতামত দিচ্ছেন। কিন্তু কখনোই এ প্রশ্ন আসেনি ঘোড়ার সওয়ারী হিসেবে কিশোর কিশোরীর ব্যবহার শিশুশ্রমের মধ্যে পড়ে। এ বিষয়ে নানা জন নানা মত প্রকাশ করেন। যদিও সারা দেশে ঘোড়া দৌড় এখন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপ্রিল গ্রামীণ খেলা হিসেবে পুনরায় ফিরে এসেছে। অনেকেই আজ সৌখিন ঘোড়া পালন করেন শুধু দৌড়ে অংশ গ্রহন করার জন্য।

শুক্রবার চুনারুঘাটের ঘোড়া দৌড়ে দেশের সাতক্ষীরা, বগুড়া, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দামী দামী ঘোড়া অংশ নিয়েছিল। যা এ অঞ্চলের মানুষকে বিনোদন দিয়েছে।
শিশুদের ঘোড়ার সওয়ারী হওয়ার নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলেছি। তাদের মতামতে কোথাও ঘোড়া দৌড়ের খেলায় শিশুশ্রমের কথা বলা নেই। এটি মুলত জাতীয় কোন খেলা নয়, এটি অতি প্রাচীন গ্রামীণ একটি খেলা। এ খেলা নিচক মানুষকে বিনোদন দেয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে এ খেলা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সেখানকার মেলা বা উৎসব মানেই ঘোড়ার দৌড় হবে। উত্তরাঞ্চলের নওগার মেয়ে তাসমিনার কথা আমরা সবাই জানি। দেশসেবা ১৩ বছর বয়সী তাসমিনা ঘোড়াসওয়ারী হয়ে আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার পেয়েছে। ঘোড়সওয়ারি তাসমিনাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপলস’ এ স্থান পাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে তাসমিনা।

ইতিমধ্যে প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা’ বেশকয়েকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তাসমিনাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং পিপলস’ এ স্থান পাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তাসমিনা। ইতিমধ্যে প্রামাণ্যচিত্র ‘অশ্বারোহী তাসমিনা’ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।তাকে নিয়ে তৈরী হয়েছে অশ্বারোহী তাসমিনা একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। সোনিয়া সর্বশেষ জানায়, সেও তাসমিনার মতো হতে চায়।

আজকের সর্বশেষ সব খবর