শুক্রবার | ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

প্রবন্ধ : সুস্থতা অনেক বড় নেয়ামত

প্রকাশিত :

মুফতী মুহাম্মাদ আবিদুর রহমান :

———————————–
.সুস্থতা, যুক্তাক্ষরসহ বাংলা চার বর্ণের একটি শব্দ। কিন্তু এর পরিধি এতো বিশাল যে হিসেব করে কুল কিনারা পাওয়া রীতিমত মুশকিল। এটি আরবি সিহ্হাতুন শব্দের তরজমা বা প্রতিশব্দ। সিহ্হাতকে সুখ-স্বাচ্ছনাও বলা চলে। সিহ্হাত আল্লাহর তরফ থেকে পাওয়া মানুষের জীবনে সবচে বড় নেয়ামত। যে জীবনে সুস্থতা নেই, সে জীবন নয়। সুখহীন বেঁচে থাকা জীবন্ত লাশের নামান্তর। মানুষ এক টুকরো সুখ ও সুস্থতা লাভের বিনিময়ে তার নিজেস্ব দুনিয়ার সবকিছু উজার করে দিতেও পরওয়া করে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাও চান তার সৃষ্টির শ্রেষ্টজীব মানুষও যেনো সুখে থাকে, সুস্থ থাকে। তিনি চান তাঁর বান্দা কেবল দুনিয়া নয় পরকালেও সুখে শান্তিতে থাকুক। তাই সুখ ও সুস্থতার মালিক ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বান্দাকে সুখে শান্তিতে থাকার দোয়া বাতলে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে ___রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াক্বিনা আজাবান্নার (তরজমা) হে আল্লাহ আপনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে সুখ ও সুস্থতা দান করুন। এবং আমাদেরকে রক্ষা করুন জাহান্নাম থেকে। আল্লামা সূদ্দি রাহ. উদৃত আয়াতের হাসানার ব্যাখ্যায় বলেন ; আয়াতে হাসানা মানে সুখ ও সুস্থতা।
ইমাম তিরমিযি রাহ. উবাইদুল্লাহ ইবনে মুহসিন রাযি.সুত্রে বর্ণনা করেন, হযরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন ; যার দিনের শুরুটা এমন হয় যে, তার শারীর সুস্থ, মনটাও ভালো এবং তার ঘরে দিনটি চলার পরিমাণ খাবার মজুদ আছে সে যেনো গোটা দুনিয়াকে তার হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলো। হাদিস থেকে অনুমান করা যায় শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রসন্নতা কতো বড় নেয়ামত।
.
সুস্থতা কেবল দুনিয়ার জন্য অথবা দুনিয়াদার মানুষেরই চাওয়া নয় বরং এটি দ্বীনদার এবং দুনিয়াদার উভয় কিসিমের মানুষের এক মৌলিক চাহিদা। শরীর সুস্থ না থাকলে যেমন দুনিয়াবী কাজ কর্ম করা যায় না, তেমনি নামাজ রোজা ইবাদত বন্দেগী করাটাও মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। সৃষ্টির সবচে বড় মহান মানুষটি __যার জীবনের প্রতিটি স্পন্দন শুধু পরকালের জন্য নয় কিয়ামত পর্যন্ত পরকাল বিশ্বাসী সকল মানুষের জন্য অনিবার্য আদর্শ, সেই নবিয়ে রহমত সা. নিজেও তাঁর শারীরিক সুস্থতা চেয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করতেন। হাদিস শরীফে আছে রাসুলে কারিম সা. সকাল সন্ধ্যায় তিনতিন বার করে দোয়া করতেন ; আল্লাহুম্মা আফিনী ফি বাদানী, আল্লাহুম্মা আফিনী ফি ছাময়ী, আল্লাহুম্মা আফিনী ফি বাছারী লা-ইলাহা ইল্লা আংতা (তরজমা) হে আল্লাহ, আপনি আমার শরীরকে সুস্থ রাখুন। হে আল্লাহ, আপনি আমার শ্রুতশক্তিকে (কানকে) সুস্থ রাখুন। হে আল্লাহ, আপনি আমার দৃষ্টিশক্তিকে (চোখকে) সুস্থ রাখুন। আপনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নাই।
.
সুস্থতা এমন একটি নেয়ামত যার ব্যাপারে মানুষের কাছ থেকে কিয়ামতের দিন আলাদাভাবে জবাব চাওয়া করা হবে। রাসুলে আকরাম সা. ইরশাদ করছেন; আল্লাহ তায়ালা কিয়মতের দিন মানুষের কাছে সর্বপ্রথম নেয়ামতের জবাব চেয়ে বলবেন ; আমি কি তোমাকে সুস্থতা দান করিনি! আর পান করতে দেইনি শীতল পানি? (তিরমিযী শরীফ হাদিস নং ৩৩৫৮)
রইসুল মুফাসসিরিন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. সুরা তাকাসুরের আয়াত (তরজমা) – অতপর সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’ এর তাফসিরে বলেন এখানে নেয়ামত বলে, শরীর, চোখ ও কানের সুস্থতার দিকে ইশারা করা হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। তিনি এই ব্যাখ্যার স্বপক্ষে কুরআনুল কারিমের আরেকটি আয়াতের উদৃতি পেশ করে বলেন; আল্লাহ জাল্লাশানুহু ইরশাদ ফরমান, নিশ্চয় অন্তর, চোখ ও কান, এর প্রত্যেকটির সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।
.
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উপর অনিবার্য যে, সে যেনো আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত __সিহ্হাত ও আফিয়াতের কদর করে। হাদিস শরীফে রাসুলে আকরাম সা.ইরশাদ করেন অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই সুস্থতাকে কাজে লাগাও। অন্য একটি রেওয়াতে অনেকাটা তির্যক ধারায় জানতে চেয়েছেন (এই যে তোমরা সুস্থতাকে কাজে লাগাচ্ছো না) তবে কি তোমরা অসুস্থ হয়ে পড়ার অপেক্ষা করছো! (যে রোগাক্রান্ত হলে পরে আল্লাহকে ডাকবে?) হাদিসে কুদসীতে রাসুলে আকরাম সা. আরো বলেন; আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে সকল মানুষ সুদিনে আমাকে ডাকে, দুর্দিনে আমি তার ডাকে সাড়া দেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সুস্থতা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
.
লেখক : ইমাম ও খতীব, বায়তুল আমান জামে মসজিদ,

ঢাকা ১২০৬।

আজকের সর্বশেষ সব খবর