রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

লটারিতে স্কুলে ভর্তি বৈষম্য কমাবে

প্রকাশিত :

শাহ ফখরুজ্জামান : আদিকালেও মানুষ যখন কোনো সমস্যায় পড়েছে, তা মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কার করেছে। মূলত সমস্যা থেকে উত্তোরণ এবং পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালোভাবে মোকাবিলা করতেই হয় বিভিন্ন উদ্ভাবন। বর্তমানেও গোটাবিশ্ব কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। একদিকে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা চলছে, অন্যদিকে ভাইরাসটিকে কীভাবে এড়িয়ে সামনে এগোনো যায় সে কৌশল গবেষণা। তা নিয়েও অনেক উদ্ভাবন হচ্ছে সারাবিশ্বে। কাংলাদেশেও অনেক উদ্ভাবন ফলপ্রসূ হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে আরও স্মার্ট করেছে বলা যায়।

এই করোনাভাইরাস শিক্ষাক্ষেত্রেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। তা ভেবে একটার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এসেছে। এরমধ্যে সম্প্রতি আগামী শিক্ষাবর্ষে হাইস্কুলগুলোতে ভর্তি নিয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অনন্য মনে হয়েছে। এবার হাইস্কুলগুলোর সব শ্রেণিতে পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একই ধরনের ব্যবস্থা না হয়ে বহুমাত্রিক হওয়ায় বরাবরই অভিভাবকরা নামকরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করার জন্য ওঠেপড়ে লেগে যান। এই সংস্কৃতি অনেক পুরনো। জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই তুলনায় মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না বাড়ায় দিনদিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। কোনো কোনো স্কুলে আসনের তুলনায় শত গুণ বেশি আবেদন। ফলে শিশু ও কিশোর বয়সেই শিক্ষার্থীদের কঠিন যুদ্ধে নামতে হয়। এই যুদ্ধে জয়ী অভিভাবকদের মনে আনন্দ দেখা দিলেও যারা ব্যর্থ হন তাদের মনে ভর করে রাজ্যের হতাশা। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীর সরকারি স্কুলগুলোতে লটারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে অনেক আগেই। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রাজধানীর স্কুলগুলোতে লটারির মাধ্যমে ভর্তির সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন “যে শিশু শিক্ষাজীবন শুরুই করেনি তাকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানোর কোনো যুক্তি নেই”। মূলত যে শিশু কোনোদিন স্কুলেই যায়নি তাকে ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে তখন এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের পর রাজধানীর স্কুলগুলোতে ভর্তি নিয়ে অনিয়মের তেমন কোনো খবর
চোখে পড়েনি। এর আগে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে প্রাইভেট টিউটররা অনেক টাকা নিয়ে বাচ্চাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন। এর বাইরে তদবির আর সিট বাণিজ্যের কথাও শোনা যেত।

রাজধানীর স্কুলগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া লটারিতে হওয়া অনেক কার্যক্রম প্রমাণিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা ছিল পর্যায়ক্রমে দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ বা দাবি চোখে পড়েনি। তবে এবার করোনার কারণে সরকার সারাদেশের জন্য লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আবার মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই মনে করছেন, এতে করে ভালো প্রতিষ্ঠানে কম মেধাবীরা সুযোগ পেয়ে যাবে। আবার দুর্বল প্রতিষ্ঠানে বাধ্য হয়ে মেধাবীদের পড়তে হবে। এটি বাস্তব হলেও আমি মনে করি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগে তাদের উন্নতি করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার মেধাবী শিক্ষার্থী পেয়ে অনেক দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবল হয়ে উঠবে। শুধু মানসম্মতরা এক জায়গায় পড়বে আর কম মানসম্মত দরিদ্র শিক্ষার্থী, যারা প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারে না, তারা খারাপ স্কুলে পড়বে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে এই পদ্ধতিতে। অর্থ্যাৎ সাম্য নিশ্চিত হবে। পিছিয়ে পড়ারাও সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ পাবে।

সব ভালো শিক্ষার্থী যদি একই স্কুলে থাকে, তাহলে সেখানে প্রতিযোগিতা হয় কে কার চেয়ে বেশি উৎকর্ষ তা প্রমাণের। আর যদি দুর্বল প্রতিষ্ঠানে সব দুর্বলদের প্রতিযোগিতা হয়, তখন সেখানে তেমন কোনো প্রতিযোগিতা থাকে না। ফলে উচ্চশিক্ষার ভালো আসনগুলোতে সুযোগ পায় সেই ভালো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আমার মনে হয়, যদি দুর্বল আর সবলের মিশ্রণ থাকে সব প্রতিষ্ঠানে, তাহলে ভালোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দুর্বলরাও সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্বের ওপর নির্ভর করবে সফলতা।

সরকার এবার সব শ্রেণিতেই লটারির কথা বলেছে। এক্ষেত্রে উচ্চ শ্রেণির জন্য বিগত সময়ে অনুষ্ঠিত যেকোনো পরীক্ষাকে ভিত্তি ধরে আবেদনের জন্য নূন্যতম মানদণ্ড তৈরি করলে আরও ভালো হত। যেমন ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে যেহেতু পিএসসি পরীক্ষা হয়নি, তাই কোনো মানদণ্ড না দিয়ে উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে। কিন্তু সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির ক্ষেত্রে তাদের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আবেদনের যোগ্যতা নূন্যতম জিপিএ-৪ করা যেত।

হবিগঞ্জ শহরের দুটি নামকরা স্কুল বিকেজিসি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় এবং ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও দিনের পর দিন প্রতিযোগিতা বাড়তির দিকে। হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহিরের প্রচেষ্টায় দুটি স্কুলে ডাবল শিফট হলেও প্রতিযোগিতা কমেনি। প্রতিবছর এখানে ভর্তি পরীক্ষার নামে ভর্তিযুদ্ধে নামে শিশু ও অবিভাবক। এবার লটারিতে এই ভোগান্তি কমবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে হবিগঞ্জবাসীর দুঃখ হলো জেলা শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাউন্নয়নের ফলে জেলা শহরে জনসংখ্যার চাপ থাকলেও শহরের প্রধান এলাকায় গত ৫০ বছরেও গড়ে উঠেনি নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কয়েক প্রজন্ম ধরেই এখানে দুটি সরকারি স্কুলের পাশাপাশি জেকে অ্যান্ড এইচকে হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, হবিগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও হবিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজই একমাত্র ভরসা। কোনো কোনো স্কুলে আড়াই হাজার শিক্ষার্থীও রয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। আবার সরকারি দুটি স্কুলে ভর্তির সুযোগ না পেলে অবিভাবকদের ওই তিনটি স্কুলে ভর্তি করাতে অনীহার শেষ নেই। অথচ সরকারি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও অবশিষ্ট তিনটি স্কুলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। আবার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির পরও হাইস্কুলের গণ্ডি শেষ না করেই শিক্ষাজীবন শেষ হচ্ছে অনেকের।

এখানে অভিভাবকদের মধ্যে যে বিষয়গুলো কাজ করে তা হলো যদি তার সন্তান সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে না পারে তাতে করে তার সামাজিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের সন্তানরা বড় কিছু হতে পারবে না। সরকারি স্কুলের বাইরে ভালো লেখাপড়া হয় না ইত্যাদি। সত্যিকারভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয় মেধাবীরা। আবার সেখানকার শিক্ষার্থীদের অভিভাবক স্বচ্ছল। ফলে তাদের ভালো ফলাফল অর্জনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নগন্য। অপরদিকে বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের আপ্রাণ চেষ্টায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল
শিক্ষার্থীও ভালো ফলাফল অর্জন করে।

তাই এবারের লটারির ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বৈষম্য কমাবে। এক ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি ভাঙবে। শুধু করোনাকালেই নয়, এ পদ্ধতি স্থায়ীরূপ দিতে পারলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ভর্তিযুদ্ধ থেকে রেহাই পাবে। এ ভর্তিযুদ্ধ শিশুদের ওপর এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এই যুদ্ধের জন্য শিশুরা তাদের বিনোদন, খেলাধুলা এবং স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা থেকে বঞ্চিত হয়। সমাজ ও প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। তাদের কৈশোরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি অভিভাবকরা এক ধরনের অস্বস্তিতে পড়ে যান।

আমাদের সমাজকে ভালো স্কুলে শুধু মেধাবীরাই পড়বে এ ধারণা থেকে বের হতে না পারলে দিনের পর দিন বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। আবার বাছাই করা মেধাবীদের নিয়ে ভালো ফলাফল অর্জন করে কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত কৃতিত্ব প্রমাণ করতে পারে না। যদি সরকারি স্কুলে কম মেধাবীরা ভর্তির সুযোগ পায় এবং ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারে তাহলেই প্রমাণ হবে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলো আসলেই সেরা। প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা পরিমাণের জন্যও লটারি পদ্ধতি একটি লেবেল প্লেয়িং কন্ডিশন তৈরি করবে। তাই লটারি পদ্ধতিকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়ার দাবি জানাই।
এছাড়া আগামীতে লটারির সুযোগ পাওয়ার জন্য নূন্যতম মানদণ্ড নির্ধারণ করলে ব্যবস্থাটি অনেক শৃঙ্খল হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও আইনজীবী, হবিগঞ্জ।

আজকের সর্বশেষ সব খবর