রবিবার | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

সা ক্ষা ৎ কা র : সরকারি ব্যাংকে আস্থা বাড়ছে – ড. জায়েদ বখত

প্রকাশিত :

তরঙ্গ ডেস্ক : রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক। অগ্রণী ব্যাংক ও ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রশ্ন : রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে রয়েছে নানা নেতিবাচক আলোচনা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি?

জায়েদ বখত: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংকের সমস্যার কারণে ব্যাংক খাতে একটা উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আগে সরকারি ব্যাংক থেকে বেসরকারি ব্যাংকে গ্রাহক চলে যেতেন। এখন বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি ব্যাংকে আসছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও ভূমিকা আছে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যত্নবান। নতুন করে যারা এসেছেন তারা অনেক উদ্যোগী ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। ভালো কিছুর জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে শীর্ষ নির্বাহী এবং পরিচালনা পর্ষদের ওপর আস্থা প্রয়োজন। তা না করে শুধু কর্মীরা খেটে মরবে এবং পর্ষদ খারাপ লোককে টাকা দেবে, সেটা হয় না। অগ্রণী ব্যাংকে এ ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থে নয়, পর্ষদ ব্যাংকের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আবার কাজের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে। এসব কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। আবার উন্নত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকই প্রথম ৯৫৮ শাখার সবই অনলাইনে চালু করেছে। ফলে রপ্তানিমুখী বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহকারী করপোরেটগুলোও অগ্রণী ব্যাংকে চলে এসেছে। যেমন দেশজুড়ে প্রাণ গ্রুপের ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছেন। তারা টাকা দিয়ে পণ্য নেন। প্রাণ গ্রুপ যত দ্রুত টাকা পাবে, তত দ্রুত পরিবেশকদের পণ্য দিয়ে থাকে। অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে এখন মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে তারা তথ্য পেয়ে যায় কে কত টাকা দিয়ে কোন পণ্যের অর্ডার করলেন। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংক শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; সরকারের উন্নয়নের অংশীদারও। আজকের ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো।

প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংকের কার্যক্রম কেমন চলছে?

জায়েদ বখত: রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানত, আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে শীর্ষে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ২০১৯ সালে অগ্রণী ব্যাংকের আমানতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত বছর এ ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোনালীর মাধ্যমে যেখানে আমদানি ছিল ২৫ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার। অগ্রণীর মাধ্যমে ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ১৪ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে। রপ্তানি বাড়াতে অগ্রণী ব্যাংক কিছু নিয়ম শিথিলের পাশাপাশি রপ্তানি ট্রফিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। তাদের আলাদা করে সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। রেমিট্যান্স বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে কৌশল। আমাদের অন্যতম রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ সিঙ্গাপুর থেকে অগ্রণীর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে টাকা পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এ অ্যাপের মাধ্যমে সেখানকার শ্রমিকরা ঘরে বসে টাকা পাঠাতে পারেন। আবার এখান থেকে যেন দ্রুত সুবিধাভোগী টাকা পেয়ে যান, সে জন্য বেশি রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক কর্মকর্তাদের উৎসাহ দিতে ল্যাপটপ দেওয়া হয়েছে। আবার নিজস্ব শাখা নেই এমন এলাকায় ২০০ এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টার খোলা হয়েছে। পাশাপাশি বিকাশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে রেমিট্যান্স পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে রেমিট্যান্স আহরণে এখন ইসলামী ব্যাংকের পরেই অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থান। পদ্মা সেতুতে এককভাবে ১২০ কোটি ডলার অর্থায়ন করেছে অগ্রণী ব্যাংক।

প্রশ্ন : প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় অগ্রণী ব্যাংক কতটুকু এগিয়েছে?

জায়েদ বখত: সব শাখা অনলাইনের আওতায় আসায় এখন যে কোনো শাখা থেকে গ্রাহক তাৎক্ষণিক অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে পারেন। যে কোনো লেনদেনের তথ্য এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা বিকাশের সঙ্গে যৌথভাবে বিতরণ করছে অগ্রণী ব্যাংক। অন্যদিকে বিদেশি সফটওয়্যারনির্ভরতা কমাতে চার ব্যাংকের অর্থায়নে একটি কোম্পানি করে নিজস্ব সফটওয়্যার করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এ জন্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি কাজ করছে। আমরা আগামীতে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে যাব। তবে এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছি। আমি চাই, অগ্রণী ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংক হোক। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গ্রাহকসেবাসহ সব হবে আন্তর্জাতিক মানের।

প্রশ্ন : অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা প্যাকেজ কতটা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?

জায়েদ বখত: করোনা সংকটের পর ছোট-বড় সব উদ্যোক্তা-প্রতিষ্ঠান নগদের সংকটে ছিল। ফলে এ প্যাকেজ খুবই সময়োপযোগী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনে যাচাই-বাছাই করে প্রণোদনার টাকা দিতে হচ্ছে বলে একটু সময় লাগছে। আবার ঋণ আদায়ের ঝুঁকির বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে। শিল্প ও সেবা খাতে অগ্রণী ব্যাংকের বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৮০০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ৬৮০ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ। সিএমএসইতে বরাদ্দের চেয়ে আবেদন কম। এর কারণ হয়তো অনেকে প্যাকেজের বিষয়টি জানেন না বা ব্যাংকের সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক নেই। অনেক ক্ষেত্রে জামানত দেওয়ার মতো অবস্থা নেই গ্রাহকের। এসব কারণে সব ব্যাংক এ খাতে ঋণ বিতরণে কমবেশি পিছিয়ে আছে। কৃষিসহ অন্য খাতে ঋণ দিতে অবশ্য ব্যাংকগুলো এগিয়ে রয়েছে।

প্রশ্ন : খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। নতুন করে যাতে খেলাপি ঋণ না বাড়ে সে জন্য ব্যাংকগুলো কী করতে পারে?

জায়েদ বখত: খেলাপি ঋণ আদায়ের অন্যতম অন্তরায় রিট আবেদন। ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নিলেই দেখা যায় একের পর এক রিট করা হচ্ছে। একটা ঋণের বিপরীতে ৭-৮টা পর্যন্ত রিট করা হয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে আলাদা বেঞ্চ গঠন করতে হবে, যাতে দ্রুত রিটগুলোর নিষ্পত্তি করা যায়। দ্বিতীয়ত, রিট করতে হলে নূ্যনতম একটি ডাউনপেমেন্ট রাখার বিধান করতে হবে। আদালতের রায় রিটকারীর পক্ষে গেলে প্রয়োজনে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মামলা করলে টাকা উদ্ধার হবে না। এর বড় উদাহরণ হলমার্ক। যে কারণে দেখেশুনে ঋণ বিতরণ করতে হবে। ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের তদারকিও করতে হবে। এর পরও পরিস্থিতি খারাপ হলে প্রয়োজনে সুবিধা দিয়ে ঋণ আদায় করতে হবে। তবে শুধু সুবিধা দিলে হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে আলাদা করতে হবে। ব্যাংকাররাই অবশ্য তাদের ঠিক করতে পারেন।

সূত্র : জাতীয় দৈনিক সমকাল পত্রিকা।

আজকের সর্বশেষ সব খবর