রবিবার | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ঈদ মোবারক

প্রকাশিত :

মাওলানা মুশাহিদ আহমদ:

ঈদ শব্দটি আরবি। এর অর্থ – আনন্দ। কারো মতে এর অর্থ – ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। ঈদ যেহেতু বছর ঘুরে বারবার আমাদের মাঝে ফিরে আসে, এজন্য ঈদকে, ঈদ বলা হয়। প্রত্যেক জাতি ও ধর্ম বছরের কিছু দিনকে আনন্দ উদযাপনের জন্য নির্ধারণ করে থাকেন। সেগুলোকে আনন্দ দিবস বলা হয়। মানব প্রকৃতি কাজের একঘেয়েমিতে কখনো কখনো অস্বস্তি বোধ করে থাকে। ফলে স্বভাবতই সে এমন কিছু দিবস -রজনী প্রত্যাশা করে, যাতে সে নিজের দৈনন্দিন কর্মসূচি থেকে সরে এসে নিজের মন ও মস্তিষ্ককে অবসর দান করবে। মানব প্রকৃতির এ আবেদন থেকেই “আনন্দ দিবসের ” জন্ম। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র মক্কা থেকে হিজরত করে পবিত্র মদীনায় শুভাগমন করে দেখতে পেলেন যে, সেখানকার অধিবাসীরা ” নওরোজ ও মেহেরজান ” নামে দুটি আনন্দ দিবস উদযাপন করে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাদের আনন্দ উদযাপনে অংশগ্রহণ করবেন কি-না সে ব্যাপারে জানতে চাইলেন। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এর পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। একটি ঈদুল ফিতরের দিন, অপরটি ঈদুল আযহার দিন। মুসলমানদের সারা বছরে উৎসব মাত্র দুটি। অথচ অন্যান্য ধর্মে উৎসবের সংখ্যা অনেক। ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও হিন্দুরা যে সব উৎসব উদযাপন করে, ইসলামের উৎসব সেগুলো থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করে অতীত কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেমন ২৫ ডিসেম্বর খ্রিস্টানদের বড় দিন। তারা বলে, এই দিনে হযরত ঈসা (আঃ) জন্মেছিলেন। অনুরূপভাবে ইয়াহুদীদের ধর্মীয় উৎসব ও অতীত কোনো ঘটনার স্মারক। হযরত মূসা(আঃ) ও বনী-ইসরাঈল যেদিন ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং ফেরাউন ডুবে মরেছিল, সেদিনের স্মারক হিসেবে তারা তাদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে। একমাত্র ইসলামেরই বিরল ঐতিহ্য যে, মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনের উৎসবকে অতীত কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করা হয়নি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটেনি। এই দুই দিনের সাথে অতীত ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সম্পর্ক বর্তমানের সাথে। ঈদুল ফিতর আসে রমযানের রোযা সম্পন্ন করার পর।বান্দা একটি মাস ইবাদতে নিমগ্ন ছিলো। পানাহার ও যৌনমিলন আল্লাহর জন্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলো। এরই পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ঈদুল ফিতর দান করেছেন। ঈদুল আযহা আসে হজ্ব নামক ইবাদত সম্পন্ন হওয়ার পর। হজের সব চেয়ে বড় রোকন হলো আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। এটা যিলহজ্বের নয় তারিখে আদায় করা হয়। এইদিন পৃথিবীর লাখো লাখো মুসলমান আরাফার ময়দানে জমায়েত হয়ে হজ ইবাদত সম্পন্ন করে। এরই পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তায়ালা পরের দিন তথা ১০ যিলহজ্বকে ঈদুল আযহার দিন হিসেবে দান করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এই শিক্ষা দিলেন যে, অতীত তো অতীতই। অতীতের অস্তিত্ব বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য অতীত কোনো ঘটনার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের ঈদ উৎসব নয়। কারণ, অতীত ইতিহাস মুসলমানদের মাঝে উদ্দীপনা, আগ্রহ এনে দিতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের মুক্তির জন্য শুধু এই আগ্রহ যথেষ্ট নয়। পূর্বপুরুষদের কীর্তি দ্বারা কেউ পরকালে পার পাবে না। বরং পরকালে প্রত্যেককে নিজের আমলের জবাব দিতে হবে। সুতরাং অতীত ঘটনা নিয়ে আনন্দে মেতে থাকা, একজন মুমিনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নিজে আমল করে দেখাতে হবে। যদি নিজের আমলে কিছু থাকে, তবে তার জন্যই “ঈদ মোবারক “।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক।

আজকের সর্বশেষ সব খবর