শনিবার | ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

একজন চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন এর জীবন ও কর্ম

প্রকাশিত :

শিব্বির আহমদ আরজু : চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন। মফস্বল সাংবাদিকতার এক কিংবদন্তি নাম। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, নাট্যকার, সমাজসেবক প্রভৃতি। তিনি দৈনিক সংবাদে ‘ পথ থেকে পথে’ ধারাবাহিক রিপোর্ট করে খ্যাতি লাভ করেন।

মোনাজাত উদ্দিন ১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার মরলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন সরকারি চাকুরীজীবি। স্থানীয় একটি কলেজে ইন্টার মিডিয়েট পাস করে ডিগ্রি অধ্যয়নরত অবস্থায় পিতা মারা যান। সংসারের দায়িত্ব পড়ে তাঁর উপর। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে প্রাইমারি স্কুলে চাকুরী নেন।

বেতন কম। মাস্টারি বাদ দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পাইভেট পড়ান। প্রাইভেটেও বেশি দিন থিতু হতে পারেননি তিনি। সুযোগ পেয়ে ডুকে পড়লেন বগুড়ার বুলেটিন পত্রিকায়। পরবর্তীতে নিজেই পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি সম্পাদক। সেটাই রংপুরের প্রথম পত্রিকা।
প্রকাশকের সাথে বনিবনা না হওয়ায় আর্থিক অনটনে পড়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। মোনাজাত উদ্দিন বেকার হয়ে পড়েন। জীবন-জীবিকার তাগিদে তিনি বাধ্য হয়ে কিছুদিন একটি কীটনাশক কোম্পানীতে চাকুরী করেন।

এর পর তিনি তৎকালীন সাড়া জাগানো ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংবাদে রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ পান। শুরু হয় নতুন পথ চলা। গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে, পথে প্রান্তরে তিনি চষে বেড়াচ্ছেন দিন-রাত। সংগ্রহ করেছেন অনুসন্ধানী সব রিপোর্ট। বলতে গেলে সংবাদের ভেতরের সংবাদ তিনি বের করে আনতেন অনায়াসেই। মাদক,জুয়া,চোরাকারবারিরা ভীত সন্ত্রস্থ থাকতো সব সময়।

দৈনিক সংবাদে কাজ করলেন টানা ২০ বছর। তিনি পত্রিকা সার্কুলেশনের স্বার্থে অনেক সময় নিজে পত্রিকা বিলি করতেন। সারাদিন সংবাদ সংগ্রহ করে ঢাকায় চলে যেতেন দৈনিক সংবাদ অফিসে।সেখানেই রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়তেন।সকাল হলে পত্রিকা নিয়ে রংপুর গিয়ে বিলি করতেন। তিনি ছিলেন সাদা মনের মানুষ এবং নিরহংকার।

১৯৯৫ সালে ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি থানাধীন যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে দু’টি নৌকা ডুবির রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে ফেঁড়ি থেকে পানিতে পড়ে মারা যান। এ মৃত্যুতে জাতি একজন চারণ সাংবাদিককে হারালো। এ ঘটনা জানাজানি হলে পরদিন জাতীয় পত্রিকা গুলো ফলাও করে মোনাজাত উদ্দিন এর বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে নিউজ করেন। রংপুরসহ সারা দেশের সাংবাদিক সমাজ শোকে মুখ্যমান।

মোনাজাত উদ্দিন কোনদিন অনুমানের উপর নিউজ করেননি। যেখানেই ঘটনা, সেখানেই মোনাজাত উদ্দিন। উদ্দেশ্য একটাই, সংবাদের ভেতরের সংবাদ তুলে আনা। সে কাজটার জন্যই মূলত তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন।
অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলেও কোনদিন অপরাধের কালিমা স্পর্শ করেনি তাঁকে। তিনি ছিলেন নিবিষ্ট মনের এক অসাধারণ সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিক।

তাঁর ধ্যান-জ্ঞান একটাই ছিল সঠিক তথ্য উদঘাটন করে যা সত্য তাই প্রকাশ হবে। এভাবেই তিনি চারণ সাংবাদিক ও মফস্বল সাংবাদিকতার পথিৃৎ হয়ে উঠেছিলেন। ঠাই নিয়েছেন কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোটায়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন মোনাজাত উদ্দিনকে। তা ছাড়াও তিনি দেশ বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ১১টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে সাংবাদিকতা নিয়ও একাধিক বই লিখেছেন। মোনাজাত উদ্দিন নেই, কিন্তু বেঁচে থাকবেন আদর্শে ও কর্মে। যুগ যুগান্তর ধরে। পরিশেষে এ মানুষটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং সংবাদ জগতে আরও মোনাজাত উদ্দিন সৃষ্টি হউক এ দোয়া করি।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, তরঙ্গ টোয়েন্টিফোর ডট কম।

আজকের সর্বশেষ সব খবর