রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

মত ও পথের অর্থ ঘৃণা বিদ্বেষ নয়

প্রকাশিত :

শরীফ উদ্দিন পেশোয়ার :
পৃথিবীতে মত ও পথের ভিন্নতা রয়েছে।মত ও পথের পার্থক্যের অর্থ এই নয় যে,আপনাকে আমি ঘৃণা করব! বিদ্বেষ ছড়াব! মুসলমান থেকে খারিজ ভাববো !মত ও পথের পার্থক্য থাকতেই পারে।মহান আল্লাহ তায়ালা ও সুন্দর ভাষায় বলেছেন,লাকুম দী-নুকুম ওয়ালী এদীন !আল্লাহতায়ালা আরো বলেন,তাদের উপদেশ দাও কোরআনের মাধ্যমে,সুন্দর ভাষায়। হেকমতের সাথে। আল্লাহ তায়ালা বিদ্বেষ,গীবত- ফেৎনা বা হিংসা চান না। এখন আমরা দেখতে পাই, সংগঠন বিশেষ করে ইসলাম পন্থি মানে আমরা একদল আরেক দলকে এক আলেম আরেক আলেমকে সহ্য করতে পারছি না । অন্যমত ও পথকে সঠিক বলতে পারছি না । কেউ কারো কথা বা ওয়াজ শুনতে চাই না।একদলের আলেমকে আরেক দলের বা মতাদর্শের আলেমকে ওয়াজে দাওয়াত দেই না ইত্যাদি।

অনেক ওয়াজের পোস্টারে দেখি অমুক ছুন্নি মহাসম্মেলন। তমুক ইসলামি সম্মেলন,আশেকে রসুল সম্মেলন।
এতেই বুঝি, অন্যরা যাতে না আসে। এক বক্তা একদিন শুনলাম ওয়াজে বলছেন,ওই এখানে কেরে চেচামেচি করছে রে। ওরে বাইর করে দেন । ও হলো ওয়াহাবির বাঁচ্চা।
অনেক জায়গায় দেখি,ছুন্নিরা ওহাবীদের নবির শত্রু ভাবে ।আর ওহাবীরা ছুন্নিদের ইসলাম থেকে খারিজ করে দেন। কেউ বলেন,হেরা লম্বা টুপি পড়ে । আরেক দল বলেন ওহাবিরা গোল টুপি পড়ে ।অমুকরা ছোট জামা পড়ে। তমুকরা লম্বা জামা পড়ে। অমুকরা দাঁড়ি ছোট রাখে। আমার মনে হয় এতে ইসলামের কিছু যায় আসে না। শেখসাদী রহ. বলেন,দলকাত বচে কার আইয়াদ ও তছবিহ ও মোরাক্কা,খোদরা আজ আমল হায়ে নেকুহিদাহ্ বরি দার।
হাজত ব কোলাহে বরকি দাশতানাত নিস্ত।
দরবেশ সেফাত বাশ ও কোলাহে তাতারি দার।
কবিতাটির অর্থ হচ্ছে,তোমার নেংটি কি কাজে আসবে? তোমার তছবিহ তাহ্লিল ও বহু তালিযুক্ত জামা কোন কাজে আসবে না। নিজেকে অন্যায় কাজ হতে বিরত রেখে পবিত্র থাক। তোমার পশমি টুপির আবশ্যক নেই। দরবেশের গুনাবলি অর্জণ কর এবং ফৌজি টুপি পরিধান কর।
ঈমাম গাজ্জালি রহ.বলেছেন,মানুষের দোষত্রুটি গোপন করা ওয়াজীব। আলেমের দোষ ত্রুটি গোপন করা আরো বড় ওয়াজিব। কেননা আলেমের দোষত্রুটি প্রকাশিত হলে সাধারণ মানুষ অন্যায় করতে দ্বিধা করবে না। এখন আমরা সকলি আলেমের দোষত্রুটি বা গীবত করায় বেপরোয়া। আলেমদের মধ্যে স্বভাবতই মত পার্থক্য থাকতেই পারে। যেমন আল্লাহর রাসুল সা.কখনো ওজুতে চার,পাঁচ,সাত কিংবা আট ফরজ ও পালন করেছেন। রমযানে আবার বার বা বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েছেন। কখনো বা পড়েনইনি। হযরত ওমর রা. বিশ রাকাত তারাবিহ জামায়াতে পড়ার রেওয়াজ চালু করেছেন। আমাদের চার ঈমামগণ পর্যবেক্ষণ করে নিজের মত করে ওজুর ফরজ ঠিক করেছেন । এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে রাসুলই পছন্দ করেননি । কোন আলেম এমন কিছু করে ফেললে দোষের কিছু নেই।

কেউ যদি দেখেন,মাহফিলে নবি সা. হাজীর হয়েছেন তারা দাঁড়াতেই পারেন। এমন কিছু চোখ আছে নবিকে দেখতেই পারেন ।হাদিসে এসেছে,যে নবিকে স্বপ্নে দেখল সে বাস্তবেই দেখেছে বা দেখবে। নবি সা. রওয়াজা শরিফ থেকে সালামের জবাব হাত বাড়ি দিয়েছেন বলে কথিত আছে ।

যা বলছিলাম, আর যারা দেখেননি তারা বসেই দরুদ পড়তেই পারেন। ফেরেশতারা দুরুদ পাঠায় বলে অনেকেই জানেন । আবার যারা বলেন নবি মাটির তৈরি এটা ও ঠিক । যারা বলেন নুরের তৈরি এটা ও ঠিক। কারণ সব মানুষকেই মাটি দিয়ে তৈরি করেছেন আবার মানুষের আত্মা কিন্তু মাটির তৈরি নয়, নুরের তৈরি। আত্মারই প্রাধান্য শরীরের উপর। তাই নুরের তৈরি বলা যেতে পারে। আবার শরীর যে সমস্ত উপাদান দিয়ে তৈরী এর মধ্যে মাটির ভাগই বেশি।তাই মাটির তৈরী বলা যেতে পারে। কারণ মিষ্টি যদি অনেক কিছু দ্বারা তৈরী তবু চিনির ভাগ বেশি বলে বলা হয় মিষ্টি। যাক, সব মানুষই মাটি ও নুরের তৈরি । এ গুলো তর্কের বিষয় নয়। বুঝার বিষয়। তর্কে বহু দুর। ধর্মের যাত্রীরা আল্লাহ তায়ালাকে সব কিছুর উপর প্রাধান্য দিলে ও জিকির বজায় রাখলে ভেতরেই ভেদ জমা হবে। তবে একটি কথা বলতেই হয় নবি কিন্তু সাধারণ মানুষ নন।

পবিত্র আল কোরানে নবি সম্পর্কে এসেছে,আমি তোমাদের মতই মানুষ। তবে আমার কাছে ওহি নাজিল হয়।
পার্থক্য ওহি দ্বারা করা হয়েছে। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। কোন জায়গায় বৃষ্টি হয় ? কোন জায়গায় আল্লাহর রহমত নাজিল হয়? কোন জায়গায় জ্ঞান-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীর জন্ম হয় ?
কোন পানিতে ছবি দেখা যায়। কোন আয়নায় ছবি পরিস্কার ভাসে?
ওহি আসার মত একটি অন্তর ছিল আমাদের নবিসহ সকল নবিদের ।আর সাধনা দ্বারা আওলিয়াদের অন্তর পরিস্কার করে নেয়ার কারণে গোপণ অনেক ভেদের খবর আসে। নবিদের কাছে ওহি আসা সম্পুর্ণ আল্লাহর নির্বাচন । আর ওলিদের কাছে ভেদ আসা অনেকটাই নিজের চেষ্টা সাধনার ব্যাপার। লোভ, হিংসা ও অহংকারকে অন্তর থেকে বিদায় করতে হয়। যারা তর্ক বা গীবত করে তারা অহংকার ও হিংসায় ভোগেন। তারা মনে করতে পারেন আমি অনেক কিছু জেনে গেছি। ওই লোক আমার চেয়ে কম জানে। আর আমি যেটা জেনেছি সেটাই সত্য।
আল্লাহ বলন, ওদের কাছে জ্ঞান আসার পর ও শুধু পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষবশত নিজদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়,(সুরা শুরা)।

তবে যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেন এবং টাকার কাছে বিক্রি হয়েছেন আর জানেন কম, দাবি করেন যে আজহারি কিংবা ওলিপুরি হয়ে গেছি, তাদের এড়িয়ে চলতে হবে ।

কেউ কেউ আছেন,সমস্ত আলেম-ওলামাদের কটু বাক্যে কোনঠাসা করতে চান,মন্দ বলেন। অথচ হাদিসে এসেছে,নিশ্চয়ই জ্ঞানীর মর্যাদা আবাদের উপর এরুপ,পূর্ণিমার চাঁদের মর্যাদা যেরুপ সকল তারকা রাজির উপর। নিশ্চয় আলেমগণ নবিগণের উত্তরসূরী(আবু দাউদ)। আল্লাহ বলেন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা সমান নয়। এখন আমরা যদি আলেমদের ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করি বা তাদের সকলের ওয়াজ না শুনি সত্য বুঝব কিভাবে ? আমরা সব আলেম বা জ্ঞানীদের কথা ও লেখা যতটুকু সম্ভব পড়ব এবং বুঝার চেষ্টা করব। এক পক্ষের কথা বা কিতাব পড়ে কিছু বুঝে আসবে না । শিক্ষার জন্য অন্তরটা খোলে রাখব। যাদের সাথে আবুবকর রা. ওমার রা. আলি রা. ও ফাতেমা রা.সহ নবির আহালদের জীবণ মিলে যাবে তাদের ফলো করব। যারা নামাজ পড়েন না,হক কথা বলেন না,সৃষ্টির খেদমত করেন না। তাদের বিনয়ের সাথে বুঝাব,না পারলে বলব,লা ইকরাহা ফিদ্ধিন।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

আজকের সর্বশেষ সব খবর