রবিবার | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

সাবেকমন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ : কিছু স্মৃতি

প্রকাশিত :
ড. শেখ ফজলে এলাহী :
হাটহাজারীতে ইউ এন ও এর দায়িত্ব পালনকালে মেয়র এবং এমপির মাইনকা চিপায় পড়ে বদলী হলাম খাগড়াছড়ি। বিপদে-আপদে আমি বন্ধু ব্যাচমেট Muhammad Abu Nur Siddique এর পরামর্শ নিতাম। সিদ্দিকের পরামর্শে যোগ দিলাম খাগড়াছড়িতে। সেখানেও আরেক ধরনের মাইনকাচিপা। একদিকে সামরিক প্রশাসন অন্যদিকে বেসামরিক প্রশাসন এই দুয়ের চাপের মধ্যে ইউএনওদের কাজ করতে হয়। সন্ধ্যা হলে খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ৯টার আগে আর খোলে না। আমার অফিসে উপজাতীয় কর্মচারীদের আধিক্য এবং তাদের অধিকাংশই শান্তি বাহিনীর প্রতি অনুগত। কেউ কেউ আবার দু’দিক বজায় রাখে। সামরিক বাহিনীর সাথে চুপিসারে কথা বলে। কিছু দিনে বুঝলাম আমার অফিসের গোপনীয়তা বলতে কিছু নাই। যাই হোক বিভিন্ন কাজ কর্মের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার এবং জেলা প্রশাসক উভয়ের সাথে আমার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চাকুরীর আরাম‌ও পেতে থাকি। এই অবস্থায় একদিন একটা ফোন এলো টাঙ্গাইল থেকে। উনি বলছেন আমি শাহজাহান সিরাজ আর আমি শুনছি শাহজাহান মিরাজ। ব্যাস কতক্ষণ উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলার পর আমি আশ্বস্ত হলাম অপরপ্রান্তে যিনি বলছেন তিনি কালিহাতীর এমপি শাহজাহান সিরাজ। অনেক আলাপ হলো মূল বক্তব্য হলো, আমাকে কালিহাতী বদলি হতে হবে। আমি বললাম মাত্র ছয় সাত মাস হলো পাহাড়ের এসেছি, এখন তো বদলে হবে না। উনি বললেন রাখেন রাখেন, আমি বদলির আদেশ এ সপ্তাহে বের করব। কথা হলো, আপনি আসবেন কিনা ? উনি আরো বললেন, কার কাছ থেকে আমার রেফারেন্স পেয়েছেন। আমি আর তার নাম উল্লেখ করলাম না। আমি আরো দুটো স্টেশনে ইউএনও ছিলাম। সেগুলোর অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। বেনামীতে উপজেলা চেয়ারম্যানের কন্টাকটারি, রিলিফের গম বিক্রি করে নেতার গাড়ি কিনে দেওয়া, একই রাস্তা কে ৫ বছরে ৫ নাম দিয়ে বরাদ্দ দেওয়াসহ বহু বিষয়ে মতান্তর এর কারণে অনেক দুর্ভোগ পোহায় ছিলাম। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিল অসহায়। তাই আবার ইউএনও হওয়া আমার ইচ্ছা ছিল না। শাহজাহান সিরাজ টেলিফোনে আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং তাকে ভাই বলে সম্বোধন করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সঙ্গে আমার আগের পরিচয় ছিল। আমি তাকে দুটো শর্ত দিলাম। ১.গমের প্রজেক্টে আশি ভাগের নিচে কোন কাজ গ্রহণযোগ্য হবে না ও প্রজেক্টে রাজনৈতিক কর্মী থাকতে পারবে না। ২. আমি এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান কারোর কোন অভাব পূরণ করতে পারব না।
তিনি বললেন, কারো কোন দাবি আপনাকে মানতে হবে না, স্বাধীনভাবে কাজ করবেন কেবল আমার কর্মীদেরকে অন্যায় হয়রানি থেকে রক্ষা করবেন। আমি রাজি হলাম।
হাটহাজারীতে এসে শাহজাহান সিরাজের যে পরিচয় পেলাম তাতে মনে হলো কালিহাতী না এলে আমি বড় ভুল করতাম। জনগণের জন্য নিবেদিত এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আমি ইতিপূর্বে আসিনি। তিনি শুধু ইশতেহার পাঠক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের নির্মাতাদের‌ও একজন। তাঁর দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি তাঁর দরদ ও আন্তরিকতা কত যে গভীর ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কিন্তু একদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
জেলা সমন্বয় সভায় মন্ত্রী ছিলেন সভাপতি। একটি বিষয়ে আইন সম্মত নয়, এটা বলার পরও শাহজাহান সিরাজ আমাকে একটি সুপারিশ ওই সভায় পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন। মন্ত্রী এই বিষয়টা নিয়ে আপত্তি করলেন এবং কথায় কথায় তাঁর সাথে আমার গোলমাল বেঁধে গেল। বিষয়টা প্রায় হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াতে পারতো। শাহজাহান সিরাজ আমার পক্ষে কিছু বলতে গেলে মন্ত্রী তাকে চুপ করে ফেলেন। আমার কাছে এটা ভালো লাগেনি। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আমি ঢাকায় বদলি হয়ে আসি।
আসলে ঐসময় শাহজাহান সিরাজ নিরপেক্ষ দলীয় এমপি ছিলেন এবং বিএনপিতে যোগ দেওয়ার কথা বার্তা চলছিল। সে কারণে মন্ত্রীর কথা তাঁকে মানতে হয়েছিল।
কালিহাতীতে যতদিন ছিলাম শাহজাহান সিরাজ কোনদিন আমাকে ইউ এন ও সাহেব বলেন নাই, ভাই বলে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁকেও একইভাবে সম্বোধন করতে আমাকে বাধ্য করেছেন। শাজাহান সিরাজের এলাকায় চাকরি করার মধ্য দিয়ে আমি কেবল মাত্র কালিহাতী নয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতির পরিবার, বঙ্গবন্ধু সেতু প্রাথমিক কাজ দেখাশোনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকজনের সাথে পরিচিতির সুযোগ হয়েছিল।
আজ শাহজাহান সিরাজ এই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে, জনমনে তিনি চিরদিন ভাস্বর থাকবেন।
আল্লাহতাআলা শাহজাহান সিরাজের কবরবাস শান্তিময় করুন এবং আখেরে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।
লেখক : গবেষক ও বহুগ্রন্থ প্রণেতা, অব: উপ সচিব, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
আজকের সর্বশেষ সব খবর