বুধবার | ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ভাইরাসঃ ১৯২০ সালের রাবিস, ২০২০ সালের করোনা

প্রকাশিত :

এম এ মজিদ:

১৯২০ সালে আফ্রিকা এবং ইন্ডিয়ায় রাবিস নামের এক ধরণের ভাইরাসের দেখা মেলে। ব্যতিক্রম এ ভাইরাসের লক্ষণ ছিল আক্রান্ত ব্যক্তির ব্রেইন ড্যামেজ করে তোলা। ভাইরাস বিশেষজ্ঞ মালবার্গার বলেছেন- এটা একটা খুবই বিপজ্জনক লক্ষণের ভাইরাস। প্রাণী থেকে ভাইরাসটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। রাবিসের এক ধরণের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। মালবার্গ জোর দিয়ে বলেছেন- দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে একশ ভাগ মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে রাবিস ভাইরাসে। ওই ভাইরাসে ১৯২০ সালে কত মানুষের মৃত্যু হয় তার সঠিক হিসাব নাই! তবে লাখের কম হবে না বলে ধারণা করেন অনেকেই। কারণ ওই সময়ে পৃথিবী ধাবরিয়ে বেড়িয়েছে হাজার বছরের ভয়ঙ্কর ভাইরাস স্প্যানিশ ফ্লু। ১৯১৮,১৯১৯ ও ১৯২০ সাল পর্যন্ত মহামারী আকারে চলা স্প্যানিশ ফ্লুতে পৃথিবীতে মানুষ মারা যায় ৫০ মিলিয়নের মতো।
একশ বছর পর ২০২০ সালে এসে হানা দিচ্ছে করোনা ভাইরাস। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত ৭শ কোটি মানুষ। ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ৮৪ লাখেরও বেশি। চীনের উহান রাজ্য থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি। এখন বিশ্বের ২২৩টি রাষ্ট্রে ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা।
গুটি বসন্ত এর কথা আমরা সবাই জানি। গুটি বসন্তে আক্রান্ত হননি এমন লোক কম বললেও ভুল হবে না। এটাও এক ধরণের ভাইরাস। হাজার বছর ধরে চলা গুটি বসন্ত কেড়ে নিয়েছে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ। গুটি বসন্তে পঙ্গুত্ব বরণ ও অন্ধ করে দেয়া মানুষের সংখ্যা লাখে লাখে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় বেশির ভাগ মানুষ গুটি বসন্তে মারা যায় এবং শারীরিকভাবে অন্ধ ও বিকলাঙ্গ হয়। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য এসেম্বলি বিশ্বকে গুটি বসন্ত মুক্ত বিশ্ব হিসাবে ঘোষণা করেছে। আমার মনে হয় এখনও গুটি বসন্ত ভিন্নরূপে মানুষকে কাবু করছে।
১৯৬৭ সালে বানর থেকে এক ধরণের ভাইরাসের উৎপত্তি হয়। মারবার্গ ভাইরাস নামের ওই ভাইরাসটি জার্মানে প্রথম ধরা পড়ে। মারবার্গ ভাইরাসের লক্ষণ ছিল প্রচন্ড জ্বর, রক্ত বমি, হার্টফেইল এবং মৃত্যু। আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় ওই ভাইরাসে। জার্মান থেকে ভাইরাসটি উগান্ডা হয়ে বেশ কয়েকটি দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নয়।
১৯৭৬ সালে সুদান ও কঙ্গু থেকে ইবুলা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে বেশ কয়েকটি দেশে। মানুষ এবং প্রাণী দুই শ্রেণির মাঝে ভাইরাসটি একসাথে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক বিরাজ করে সর্বত্র। ভাইরাসটি রক্তের সাথে মিশে যেত। রক্তক্ষনিকা দুর্বল করে মানুষকে মৃুত্যুর কোলে ঠেলে দিত। ইবুলা ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ছিলেন-বুস্টন ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর ইলকে মালবার্গার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ইবুলা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশ মানুষ ও প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে।
এইচআইভি ভাইরাসের কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। ১৯৮০ সালে এ ভাইরাসটির প্রথম দেখা মেলে। এ পর্যন্ত ৩ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে মৃত্যু বরণ করেন। আধুনিক বিশ্বে এককভাবে কোনো ভাইরাসে মানুষের মৃত্যুর তালিকায় এইচআইভিই সবার উপরে। আমেরিকায় প্রথম এইচআইভি ভাইরাস এর উৎপত্তিস্থল হলেও তা কিছু দিনের মধ্যে আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের মাঝে এ ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি। মোটা দাগে যৌন সঙ্গমের কারণে এইচআইভি ভাইরাস এক জনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে ছড়ায়। এর বাইরেও অনেক কারণ আছে। উন্নত দেশগুলো এ ক্ষেত্রে মারাত্মক সতর্ক হলেও অনুন্নত দেশের প্রতি ২৫ জনে ১জন এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত বলে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশেও এইচআইভি রোগী রয়েছে।
১৯৫০ সালে কুরিয়ান যুদ্ধের পর এক ধরণের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। তার নাম হান্টা ভাইরাস। ভাইরাসের লক্ষণ ছিল শ্বাসকষ্ট। আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে তা নিয়ন্ত্রণেও আসে। আক্রান্তদের অন্তত ১২ শতাংশ মৃত্যু বরণ করেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে মারাত্মক এবং দ্রুত সংক্রামক ভাইরাস হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে ৫ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা এখনও বিশ্বে আছে।
১৯৫০ সালে ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। মশার দেহে এ ভাইরাসটি বহমান। মশা থেকে মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু ভাইরাসে মৃত্যুর হার আক্রান্ত রোগীদের মাঝে প্রায় ৩ শতাংশ। ইবুলা ভাইরাসের সাথে এ ভাইরাসকে তুলনা করা হয়। পরবর্তী বিশ্বে ডেঙ্গু একটি মারাত্মক চিন্তার কারণ হিসাবে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশকে গত বছর নাড়িয়ে গেছে ডেঙ্গু ভাইরাস। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু রোগের কার্যকরি ভ্যাকসিন তৈরি হয়।
শিশুদের জন্য মারাত্মক ভাইরাসের নাম রোটাভাইরাস। রোটাভাইরাস ব্যতিত বিশ্বে এককভাবে কোনো ভাইরাস শিশুদের এতো বেশি ক্ষতি করেনি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত রোটাভাইরাস বিশ্বের ৪ লাখ ৫৩ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটিয়েছে। রোটা ভাইরাসের দুই ধরণের ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে। এখন তা নিয়ন্ত্রণে। শিশুদের শ্বাস প্রশ্বাস থেকে দ্রুত এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে অন্যজনে।
মার্স ভাইরাস সম্পর্কেও অনেকের ধারণা থাকতে পারে। ২০১২ সালে সৌদীআরব থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কুরিয়ায় মার্স ভাইরাস দেখা যায়। আক্রান্তদের ৩০ শতাংশ এ ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মার্স ভাইরাসটি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। দক্ষিণ চীনে ২০০২ সালে সার্স ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্বের ২৬টি দেশে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্ব ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাসটিও চীনের উহান রাজ্য থেকে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে। করোনা ভাইরাসকে সার্স ভাইরাস-২ হিসাবেও বলা হয়। করোনা ভাইরাস কভিট-২ হিসাবেও পরিচিত। বিশ্বের ভাইরাস ইতিহাস বলে চীন থেকে যেসব মরণঘাতি ভাইরাসেরই জন্ম হয়েছে, তা অল্প সময়ে দ্রুত বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে করোনা ভাইরাস চীনের উহান রাজ্যে প্রথম কোনো মানুষকে আক্রান্ত করে। ৭ মাসের মাথায় বিশ্বের ২২৩ দেশের ৮৪ লাখের বেশি মানুষ আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। তাবৎ দুনিয়ার ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো আজ চীনের করোনা ভাইরাসে কাবু। মার্স, সার্স এবং করোনা ভাইরাসের লক্ষণ প্রায় একই। তবে করোনা ভাইরাস দ্রুত সংক্রামক এবং মারাত্মক মরণব্যাধি। করোনা ভাইরাসকে ব্যতিক্রম ভাইরাস হিসাবেও মনে করা হয়। সাধারণত অন্যান্য ভাইরাস, মানুষ থেকে মানুষে, মানুষ থেকে অন্য প্রাণীতে, অন্য প্রাণী থেকে মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয়ে থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে স্টিল, লোহা, টিন, রাবার ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়ে। এবং ভাইরাসটি ক্ষেত্র বিশেষে এসবে জীবিত থাকে একাধারে তিন দিন। যার কারণে করোনা ভাইরাসটি এতো ভয়ঙ্কর!

লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী
হবিগঞ্জ ১৯ জুন ২০২০
০১৭১১-৭৮২২৩২

আজকের সর্বশেষ সব খবর