রবিবার | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ফেইসবুক কি সংবাদ প্রচারের মাধ্যম ?

প্রকাশিত :
এম এ মজিদ : আমরা প্রায় সবাই ফেইসবুকে সংবাদ দিয়ে দেই। একে অন্যের মান সম্মান মারি। কিছু ভাল সংবাদও দেই। ফেইসবুকের সংবাদ এমনিতেই কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। তারপরও লিখা হয়। যত সমস্যা ফেইসবুকের এই সংবাদ নিয়ে। করোনা আপডেট বা অন্য কোন সংবাদ ফেইসবুকে পোস্ট করতে কে আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছে? যদিও তা প্রায় সবাই দিচ্ছে, তাতে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বেশি, হাজার কোটি টাকা খরচ করে একেকটি টিভি চ্যানেল প্রচারে আসে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে একেকটি পত্রিকা বাজারে আসে, লাখ লাখ টাকা খরচ করে একেকটি স্বনামধন্য অনলাইন মিডিয়া তৈরী করা হয়, সংবাদ এর জন্য বেতনভোগী সাংবাদিকরা রয়েছেন।
তারা অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঝুকি নিয়ে একেকটি সংবাদ পরিবেশন করেন। আর আপনি দেড় টাকার এমবি কিনে, মামা খালার দেয়া একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল দিয়ে সেটি টিপ দিয়ে পোস্ট করে দিলেন। আপনি হয়ে গেলেন হিরু আলম। তাছাড়া একেকজনের মান সম্মানহানীর একেকটি ডিপুতে পরিনত হয়ে গেছে ফেইসবুক। আমরা যদি খুব সাধারণভাবেও চিন্তা করি, তাহলে দেখবেন, ফেইস মানে মুখ, বুক মানে বই, অর্থাৎ ফেইসবুক হচ্ছে মুখমন্ডল প্রচার করার একটি ইলেক্ট্রনিক বই। সেটাতে আপনি আপনার ছবি পোষ্ট করতে পারেন, যা আপনার বন্ধু বান্ধবরা দেখবে, মজা পাবে, দুঃখ পাবে ইত্যাদি। সর্বোচ্চ আপনি আপনার নিজস্ব ভাব আবেগ অনুভূতি ভাল লাগা, খারাপ লাগা, ইত্যাদি আপনার বন্ধুদের জানাতে পারেন, জানতে পারেন। এর চেয়ে বেশি কিছু না। স্থানীয় সংবাদ, জাতীয় সংবাদ, আন্তর্জাতিক সংবাদ, অন্যের ভাল মন্দ, দোষ ত্র“টি, সাফল্য, ব্যর্থতা ইত্যাদি অন্তত আপনি আপনার ফেইসবুক ওয়ালে পোষ্ট করতে পারেন না। অন্যের কিছু জানানোর জন্য অনুমোদিত ভিন্ন মাধ্যম আছে, কর্তৃপক্ষ আছে, দায়দায়িত্বও আছে। মিডিয়া হাউজের দায়িত্বটা আপনার কাধে নিয়ে নেয়াতেই যত সমস্যা হচ্ছে। এর ভোগান্তির পরিমানও কম নয়।
ফেইসবুকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
২০০৪ সালের ৪ ফেব্র“য়ারী মার্ক জুকারবার্গ একটি এ্যাপস আবিষ্কার করেন, যার নাম দেন ফেইসবুক। অবশ্য ২০০৩ সাল থেকেই এ্যাপস টি ভিন্ন আঙ্গিকে চালু হয়ে আসছিল। মার্ক জুকারবার্গ তার কলেজ বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে, বিশেষ করে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইডুয়ার্ডু সেভারিন এন্ডু কুলাম,ডাস্টিন মুস্কভিজ, ক্রিস হাগিস একে অপরের সাথে নিজেদের হট নট বিনিময় করতেন এবং যোগাযোগ করতেন। তারা সবাই ফেইসবুক তৈরীতে একে অপরকে সহযোগিতা করেছেন। হার্ভার্ড স্টুডেন্টদের মধ্যেই ওয়েভসাইটটি সীমাবদ্ধ ছিল। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির দুই ছাত্রী ফেইসবুকে তাদের ২টি ছবি আপলোড করেন। ছবিগুলো খুবই আকর্ষনীয় ছিল।
সেই থেকে শুরু। পরে সেটি বুস্টন এলাকার কলেজগুলোতে, এরও পরে আমেরিকা ও কানাডার সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ওয়েভসাইটটির এতো বেশি ইউজার হয়ে উঠে যে, ২০০৬ সাল থেকে সর্বসাধারনের জন্য সেটি ওপেন করে দেয়া হয়। শর্ত দেয়া হয় শুধু একটি ইমেইল খুলতে হবে, আর বেশি কিছু লাগবে না। প্রথম ফেইসবুকে ছবি আপলোড করার পর ৪ ঘন্টায় ৪৫০জন সাইটটি ভিজিট করে এবং ভিউওয়ার্স ছিল ২২ হাজার। আকৃষ্ট শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এতো বেশি বাড়তে থাকে যে, পড়া লেখায় মারাত্বক ব্যাঘাত ঘটার আশংকায়, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ফেইসবুক সাইটটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। পরে অবশ্য একটি কোম্পানী করে তা আবার ওপেন করে দেন মার্ক।
ক্যালির্ফুনিয়ার স্ট্যানফোর্ড রিসার্স পার্কের গাছগাছালি ঘেরা একটি জরাজীর্ণ ঘরে প্রথমে ফেইসবুক এর হেড অফিস করা হয়। পরে ডাউনটাউন শহরে। বর্তমানে ফেইসবুকের বিশাল আকৃতির হেড অফিস ক্যালির্ফুনিয়ার মেনলু পার্কে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের সাব অফিস রয়েছে। লন্ডনে তাদের অফিসে কর্মরত আছেন ৮শ জন আইটি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ফেইসবুক এর ইউজার সংখ্যা কোটি কোটি বিলিয়ন।
আপনি কি ফেইসবুকে সংবাদ দিতে পারেন?
উত্তর খুব সহজ, আপনি ফেইসবুকে কোনো সংবাদ দিতে পারেন না। যদিও কোটি কোটি ইউজারকে কন্ট্রল করা সম্ভব না। অনেকেই ফেইসবুকে সংবাদ আপলোড করছেন। কিন্তু ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ আপনার কাছে এর জন্য কফিয়ত চাইতে পারেন। মামলাও করতে পারেন। কিভাবে? ইউজাররা যখন গণহারে ফেইসবুকে সংবাদ প্রচার করতে লাগলেন, এনিয়ে সারা বিশ্বে বিপত্তি দেখা দিল। তখন ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালে একটি ঘোষনা দেয়। গণমুখি, উৎসাহ মূলক, সীমিত আকারে সেলিব্রেটিদের জীবনী ফেইসবুকে আপলোড করা যাবে। যা ফিচারধর্মী। কারা আপলোড করতে পারবেন? শুধু মাত্র যাদের ফেইসবুক ফেরিফাইড হয়েছে, তারা। এর মধ্যে আপনি আমি পড়ি কি না একবার চিন্তুা করা দেখা দরকার। ফেইসুবক কর্তৃপক্ষ নিজেরা কিছু সংবাদ দেয়। তাও কারও মানসম্মানহানী হয় এমন কিছু না। পজিটিভ নিউজ। ওইসব নিউজে আপনি শুধু লাইক কমেন্ট এবং শেয়ার করতে পারবেন। নিজ থেকে কোনো নিউজ আপনি আপলোড করতে পারবেন না। ব্যক্তি, গোষ্টি, সম্প্রদায়ের মানহানী হয় এমন সংবাদ ফেইসবুকে দেয়ায় অনেকেই আজ জেল হাজতে নতুবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নতুবা মামলা মোকাদ্দমা হামলার শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। আমি মনে করি যদি ফেইসবুকে কোনো সংবাদ দিতেও হয়, শুধু সংবাদকর্মীরা সেটি তার সংবাদ অফিসগুলোতে পাঠাবেন এবং সেটি ফেইসবুকে দিবেন। তাহলেও এর একটি গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে, জবাবদিহী করারও ব্যবস্থা আছে। অন্য পেশার মানুষগুলো ফেইসবুকে সংবাদ পোষ্ট না করাই উত্তম।
ট্যাগ রোগঃ
এটা একটা অসহ্য যন্ত্রণার কারণ। আপনি প্রতিদিন এনিয়ে ইউজারদের মধ্যে ক্ষোভ ঝাড়তে দেখবেন। আপনার একটা লেখা, ছবি আপনি তো পোষ্ট করছেন শুধু আপনার বন্ধুরা দেখবে বলে। আপনার বন্ধুর বন্ধুদের জন্য তো সেটা না। এই সহজ কথাটা বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে চান না। বুঝলেও পালন করেন না। ২০০৫ সালের অক্টোবরের দিকে ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ ট্যাগ অপশনটি চালু করে। তাও কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। এর ইউজার সংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে ট্যাগ অপশনটি ফ্রেন্ডদের জন্য সহজ করে দেয়া হয়। এরপর থেকেই জ্বালাটা কিন্তু শুরু। প্রতিদিন শতশত ইউজার ঘোষনা দেন, “প্লিজ আমাকে কোনো কিছু ট্যাগ করবেন না”। কিন্তু কে শুনে কার কথা। আরও দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে ট্যাগ করা হয়। কিছুদিন আগে আমি একটি পোস্ট করলাম, “যারা আমাকে কোনো কিছু ট্যাগ করেন, কোনো আওয়াজ না করে আমি তাদেরকে আনফ্রেন্ড করে দেই, আপনার বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম তো আমি হতে পারি না।” মনে হচ্ছে বিষয়টিতে কিছু কাজ হচ্ছে। অনেক ফ্রেন্ড আমাকে সমর্থন করে নিজেরা তা পালন করছেন। আরেকটি রোগ হচ্ছে-প্রোফাইল লক করে ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট প্রেরণ। আমি মনে করি, কোনো প্রতিষ্ঠান না হলে, নিজ নিজ স্পষ্ট ছবি ফেইসবুক প্রোফাইলে ইউজ করাই উত্তম।
ফেইসবুক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করেঃ
যে কোনো কিছু ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি এর উত্তম ব্যবহারকারী কিনা সহজেই বুঝা যায়। আপনি জুতা পড়লেন, সেটার মাধ্যমেও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটতে পারে। কম দামী, বেশি দামী বিষয় না, বিষয়টা হল যেটা পড়ছেন, সেটা আপনার বয়সের সাথে, পেশার সাথে, সামাজিক অবস্থানের সাথে মানানসই কিনা, সেটা যথা সম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কি না। একইভাবে আপনার পরিধেয় জামা, কাপড়, টুপি, মোবাইলের স্ক্রিন কালার, মোটর সাইকেল, অন্যান্য গাড়ি ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমেও কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলা যায়, ফুটিয়ে তুলা হয়। চুলের স্টাইল, কালার, গোফ রাখার ধরণ, দাড়ি রাখার ধরন, ঘরি, ব্রেসলেট ইত্যাদিতেও সহজে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে।
ধরুন, একজন মানুষ খারাপ, সেটা কয়েকজনের কাছে হতে পারে, কিন্তু ফেইসবুকে একটি খারাপ মন্তব্য লিখলে, যা সাধারণত মুখে বলা যায় না, বিশ্বাস করুন, ফেইসবুকে আপনার ফ্রেন্ড যদি থাকে ৩ হাজার, তাহলে ৩ হাজার মানুষই আপনাকে খারাপ মনে করবে। আপনি কাউকে উদ্দেশ্য করে কিংবা কোনো একটি সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে একটি স্ট্যাটাস দিলেন, এই স্ট্যাটাসটি যে ছোট, বড়, সব সম্প্রদায়ের, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কর্মচারী, দেশের গুনিজন, আইন প্রনেতা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বিচার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, সবাই দেখতে পারেন, সেটাই আপনি ভুলে গেলেন।
ফলাফল হল, আপনাকে সবাই খারাপই মনে করবে। সেদিন একজন লিখল “ তুই ভুলে গেছিস, আমি তোর কত উপকার করছি” আচ্ছা বলুন, এই স্ট্যাটাসটা হয়তো কোনো একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, সেটি কি তার সকল ফ্রেন্ড দেখেনি, সবাই তাকে নিয়ে কি ভাববে? এ ধরনের কিংবা এর চেয়ে নিকৃষ্ট হাজারো স্ট্যাটাস আপনি পাবেন ফেইসবুকে। এসব দ্বারা ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক শিক্ষাটা প্রকাশ পেয়ে যায়। ছবি আপলোডের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। তাতেও আপনার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠতে পারে। চলুন আমরা ফেইসবুক ব্যবহার করি, তবে তা অবশ্যই নূন্যতম নীতি মেনে, অপব্যবহার না করে। উল্লেখ্য, এটি একটি সচেতনতা মূলক পোষ্ট, কোনো সংবাদ নয়।
লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী
হবিগঞ্জ ১১ জুন ২০২০
০১৭১১-৭৮২২৩২
আজকের সর্বশেষ সব খবর