বুধবার | ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

একজন ইউএনও মো. মামুন খন্দকার বেঁচে থাকবেন লাখো মানুষের হৃদয়ে

প্রকাশিত :

শিব্বির আহমদ আরজু : সম্ভবত ২০১৮ এর শেষের দিকে। হবিগঞ্জ সড়কে সিএনজি দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বানিয়াচংয়ের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা শায়খ ইকবাল হোসেন সাহেবসহ পরিবারের নারী-পুরুষ মিলে ৪ জন। এর মধ্যে তাঁর মামা শ্বশুড় আলকাব মিয়া মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। এ বিষয়টি আমার হৃদয়ে ভীষণ দাগ কাটলো। উদ্যোগ নিলাম ইউএনও মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার। সুযোগও পেলাম। হাফেজদের সামাজিক সংগঠন “বানিয়াচং তাহফিজুল কোরআন ফাউন্ডেশন” এর ব্যানারে কিছু মানুষ গেলাম। সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র আলিয়া মাদ্রাসার তৎকালিন ভাইস প্রিন্সিপাল কাজী মাওলানা মুফতি আতাউর রহমান, সাংবাদিক মখলিছ মিয়া, উপজেলা ইমাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শায়খ সিরাজুল ইসলামসহ তাহফিজের নেতৃবৃন্দ। ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে সড়ক দূর্ঘটনা রোধে আমি প্রায় ১০ মিনিট কথা বললাম। ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয় খুব মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনলেন। সমাপনী বক্তব্যে তিনি সি.ও সাহেবকে বললেন, এ বিষয়ে পৃথকভাবে কনফারেন্স করতে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন বানিয়াচংয়ের সকল পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সমিতির নেতারা। আরও উপস্থিত থাকবেন জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তাসহ আলেম-ওলামারা। ঠিক এভাবেই উপজেলার ৩য় তলার কনফারেন্স রুমে খুব সরব একটি সভা হয়েছিল সড়ক দূর্ঘটনা রোধে। এর পর সাংবাদিকতার সুবাদে ঘনিষ্টতা। করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ এর আগে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘তরঙ্গ’র উদ্যোগে বানিয়াচং থেকে গ্রাম্য দাঙ্গা, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ রোধে অনুষ্ঠিত হয়েছিল গোলটেবিল বৈঠক। সেখানে থানার অফিসার ইনচার্জ, জনপ্রতিনিধি,সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রায় ২০জন আলোচক ছিলেন। সবার কথা তিনি খুব মনোযোগ সরকারে শুনলেন। চিন্থিত করলেন সমস্যা। বের করলেন সমাধান। এতে প্রায় ৪ ঘন্টা তিনি সময় দিয়েছিলেন এ গোলটেবিলে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর খুব সাবলীলভাবে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি বানিয়াচংয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ সমস্যা/সম্ভাবনা সুবিস্তারে বললেন। ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয়ের আলোচনায় সবাই বেজায় খুশি। এ সময় সবাই আঁচ করতে পেরেছিলেন এ মানুষটি বানিয়াচঙ্গকে হৃদয় দিয়ে কতটুকু ভালোবাসেন। ইউএনও পদটি উপজেলা পর্যায়ের সর্বোচ্ছ। সরকারের কাজকর্ম সুণিপুনভাবে দেখভালো করার দায়িত্ববান ব্যক্তি হচ্ছেন ইউএনও। খুব চমৎকারভাবে প্রজ্ঞার সাথে সেই দায়িত্ব সামলিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে চমৎকার সম্পর্ক ছিল। আবার আইনের দৃষ্টিতে অপরাধি হলে নীতির ক্ষেত্রে ছিলেন সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় অটল-অবিচল। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিসহ সময়ে সময়ে নানান গুজবকে শক্তহাতে মুলোৎপাঠন করেছেন। করেছেন ঘন ঘন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা। বিশেষ করে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন প্রায় শূন্যের কোটায় এনেছিলেন। ৩ মাস আগে যখন করোনা ভাইরাস কোভিট-১৯ এর প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন দ্রব্যমূল্য হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সেখানে তৎকালিন এসিল্যান্ড মো. মতিউর রহমান খান মহোদয়কে নিয়ে সারা উপজেলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে করোনা সম্পর্কিত বিষয়ে এ জনপদের মানুষের অনেকের অজানা। জনসাধারণকে শারীরিক দূরত্বসহ সরকারি নির্দেশনা এবং স্বাস্থবিধি সম্পর্কে ধারণা দিতে ছুটে গেছেন পাড়া/ মহল্লায়। এরই মাঝে কয়েকবার করোনার স্যাম্পুলও দিয়েছেন। রিপোর্ট এসেছে নেগেটিভ, আবারও ছুটে চলেছেন পথে-প্রান্তরে, হাট-বাজারে। প্রিয় সহকর্মী এসিল্যান্ড মো. মতিউর রহমান খান আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়।

 

অফিসার ইনচার্জকে করোনাকালিন দায়িত্ব পালনে অনেকটা ব্যর্থ হওয়ায় বদলি করা হয়েছে। তখনও দমে যাননি ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয়। করোনা ভাইরাসের ভয়কে জয় করে দায়িত্বপালনে এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। যা গণমাধ্যমে ওঠে এসেছে। লক্ষ্য একটাই, এতদ অঞ্চলের জনসাধারণকে সুরক্ষা দেওয়া। বিশেষ করে করোনার শুরুর লগ্নে ঝাঁকে ঝাঁকে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসীরা দেশে আসার এক হিড়িক পড়েছিল। সেইসব প্রবাসীদের হোমকোয়ারেন্টাইনে রাখতে ছুটে চলেছেন অবিরাম প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পরবর্তীতে এর প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে লকডাউনে আটকাপড়া মানুষরা অন্যান্য জেলা থেকে এ উপজেলায় আসার প্রবণতা বেড়ে যায়। সেগুলোও তিনি আটকে দিয়েছেন। করোনার ভয়ে অন্যান্য সরকারি অনেক আমলা যখন দায়িত্ব এড়াতে ব্যস্ত, তখন এ মানুষটি উপজেলার সাড়ে ৩ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিতে পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত হিসেবে পালন করেছেন পার্শ্ববর্তী উপজেলা আজমিরীগঞ্জের দায়িত্বও। এগুলো একজন সংবাদকর্মী হিসেবে কাছ থেকে দেখা। স্বল্পভাষি অদম্য মেধাবী, কাজের প্রতি দায়িত্বশীল এবং মনের দিক থেকে সাহসী ২৯তম ব্যাচের চৌকস কর্মকর্তা ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয় এর মতো কম দেখেছি। আরেকজন মানুষ ছিলেন বানিয়াচংয়ের তৎকালিন ইউএনও সদ্য যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান। তিনিও বানিয়াচংয়ে কর্মরত থাকাকালিন দায়িত্ব পালনে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা অসাধারণ। পেশাগত কাজে দিন বা রাত যে সময়ই ফোন দিয়েছি ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয় ফোন ধরেছেন, কথা বলেছেন। মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন স্বাচ্ছন্দে। ব্যস্ততার কারণে কোন সময় ফোন না ধরতে পারলে পরে ফোন দিয়েছেন। অফিসে গেলে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন সাংবাদিকদের। এসব গুণ অনেক ইউএনও মহোদয়দের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। যখন শুনতে পেলাম আমাদের বানিয়াচংয়ের ইউএনও মহোদয় বদলী হয়েছেন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের একান্ত সচিব হয়েছেন তখন যেমন আনন্দিত হয়েছি, ঠিক তেমনিভাবে ব্যথিতও। আমাদের বানিয়াচংবাসীকে আপন করে নেওয়া সেই মানুষ মো. মামুন খন্দকার মহোদয়কে আর পাব না। জানি সরকারি চাকুরী একেক জায়গায় বেশি দিন স্থায়ী নয়। সরকারের নির্বাহী আদেশে যে কোন জায়গায় এবং যে কোন স্থানে কাজ করার মন মানসিকতা থাকতে হয় তাদের। আমি প্রাণভরে দোয়া করি ইউএনও মো. মামুন খন্দকার মহোদয় যেন পেশাগতভাবে চাকুরীর সর্বোচ্ছ জায়গায় আসীন হন। আমি বিশ্বাস করি সে সততা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম, আন্তরিকতা এবং মেধা এ মানুষটির রয়েছে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশ, ‘তরঙ্গ২৪.কম’।

আজকের সর্বশেষ সব খবর