বুধবার | ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

গাজী সমাচার

প্রকাশিত :

মো. শাহজাহান বিশ্বাস : তাঁর নাম গাজী। হবিগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে গোসাইপুর এলাকায় তাঁর বসবাস। বাবার নাম লালুর বাপ। গাজীর ভাই লালুর নামে সবাই চিনে লালুর বাপকে। লালুর বাপ একজন মুক্তিযোদ্ধা।
সহজ সরল মানুষ। উনোভাতে দিন কাটে। মুক্তিযোদ্ধা হয়েও বেকার খাটে। বুড়ো হয়ে গেছে। ইন্তেকাল করলে রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গাজী ছোটো খাটো মানুষ। মাথায় ঘন চুল। কদাচিৎ গোসল- টুসল করে। সময় পায় না। বোঝা টানতে টানতেই দিন যায়। সিনেমা হল থেকে বাচ্চু হোমিও হল পর্যন্ত তার রোজগার স্থল। সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ঐ হোমিও হলের বারান্দায় বসে থাকে। কেউ যদি ফুট-ফরমায়েশ দেয় সে আশায়।
এক ছেলে, বউ, মা-বাবা এবং একটি পঙ্গু ছোট ভাইকে নিয়ে গাজীর সংসার। ঘরে তাঁর টিভিও আছে। বউ-বাচ্চা দেখে। গাজী তাঁর বউকে খুব ভালোবাসে। বাচ্চাকে স্নেহ করে। মা- বাবাকে সেবা-যত্ম করে। বড় দুই ভাই রোজগার করে। বউ বাচ্চা নিয়ে আলাদা থাকে। চৈত-কার্তিক বারোমাস গাজী খালি পায়ে হাঁটে। হন হন করে হাঁটে। বাজারের সদাই ভর্তি থলি নিয়ে লোকজনের বাসায় পৌছে দেয়। বিনিময়ে থলে প্রতি পাঁচ টাকা কিংবা বোঝা ভারী হলে দশ টাকা। সারা দিনে শ’ খানেক হয়ে যায়। এতেই গাজী খুশি। বউ বাচ্চা মা-বাবাও ভাইকে নিয়ে দিনাতিপাত করে থাকে। গাজীর বড় গুণ সে বিশ্বাসী। সে কারো কাছে পারশ্রমিক দাবি করে না। অনেকেই ব্যাংকে তার মাধ্যমে টাকা-পয়সা জমা দেয়। বিদ্যুৎও গ্যাস বিলও জমা দেয়। যে যা দেয় তাতেই খুশি। কারো টাকা- পয়সা সে আত্মসাৎ করে না। পেশার প্রতি সে একনিষ্ঠও দায়িত্বশীল। সবাই তাকে স্নেহ করে। সিনেমা হল বাজারে খান স্টোরে আমরা নিয়মিত বসে গাল-গল্প করি। অবসর পেলে গাজীও বসে। চা-পান সিগ্রেট দোকান থেকে এনে দেয়। আমাদের বাজারের সদাই সে রোজ বাসায় পৌছে দেয়। গাজীর হাসি খুব সুন্দর। দাঁত বের করে হাসে।
সে যদি সম্পন্ন ঘরে জন্ম নিতো তাহলে তার সৌন্দর্য চিকচিক করতো। সময় এবং পরিবেশের উপর সৌন্দর্য নির্ভর করে। গাজীর সময় এবং পরিবেশ তার প্রতিকূলে। তাই তার সুপ্ত সৌন্দর্য ফুটে উঠে না। গাজীর হাসি বড়ই রহস্যজনক। সুখ-দুঃখ শোক সবকিছুতেই একই হাসি।
আমি ঢং-ঢাং করে বলি: গাজী তুই তর বউরে ভালা পাছ নারে ?
গাজী দাঁত বের করে হাসে। হি-হিহি।
তর পুলারে ?
হি-হি-হি।
দূর খালি হি-হি-হি। কছ না বে ?
হি-হি-হি। আপনে অত্তো ভালা ফাইন। গাজী ইশারায় সব বুঝিয়ে দেয়।
অই গাইজ্জা, খালিপায় থাহছ কেনে ? তর পায় ঠান্ডা লাগে না ? গরম লাগে না ? জুতা পড়ছ না কেনে ? জুতা পড়লে বোঝা দিতাইন না।
কেনেরে?
বড়লোক বোঝা বয় না।সর্বনাশ গাজীতো ছদ্মবেশী দার্শনিক। জ্ঞানী মানুষ। আসলে গাজী প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি তাকে আপন করে নিয়েছে। তাই ঠান্ডা-গরম কাবু করতে পারে না।
ঈদের কেনাকাটা করছস। মাইনষে যাকাতের টেহা দিলে করমু!
কার লাগি কি কিনবি?
পুলার লাগি জামা-জুতা, মার লাগি শাড়ি, বাবার লাগি লুঙ্গি, ভাইয়ের লাগি শার্ট।
বউ লাগি ? হি-হি-হি। শরমে তার মুখ লজ্জায় ভরে যায়।
তর বাজেট কত? তর লাগি কিনবে না? গরিবের বাজেট নাই ? পুরান কাপড় ধইয়া ফিনমু।
রোজা রাখছ?
রাখি।
রোজা কি ?
কি জানি। মাইনষে রাখে, আমিও রাখি। নামাজ পড়ছ? হি-হি-হি। কেউ শিখায় নাই।
ঈদের দিন?
মানষের সাথে উঠমু-বইমু।
বড় লোকদের ঈদ কেমন ?
তাঁরার ঈদ সারা বছরই। ঈদ আমাদের গরিবদের। গাজী তলে তলে খুব সজাগ। সবই বুঝে। কিছুই বলে না। তার বুকের তলের কান্না গুলোতে সযত্নে লুকিয়ে রাখে।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী, সাহিত্যিক, বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভূক্ত গীতিকারও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রবর্তিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক লোক সংস্কৃতি বিষয়ে সম্মানা পদক প্রাপ্ত।

আজকের সর্বশেষ সব খবর