রবিবার | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

অস্থিরতা বুঝার উপায়

প্রকাশিত :
এম এ মজিদ: চোখ মুখ দেখে মানুষের পেরেশানী বা অস্থিরতা বুঝা যায়। কথা বলার সময় ও কথা শুনার সময় আপনি বুঝতে পারবেন কার মধ্যে কতটা পেরেশানী কাজ করছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যত, আর্থিক অনটন, প্রিয় জনের বিয়োগ, আশানুরুপ ফল না পাওয়া, ঋণ গ্রস্থতা, স্বপ্ন পুরনে বাধা, সবকিছুতে নিজের হয়ে যাওয়ায় সমস্যা, ইচ্ছা মতো সবকিছুর ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, সন্তানের অবাধ্যতা, ইত্যাদি কারণে মানুষের মাঝে পেরেশানী বা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। আপনি যদি মুসলমান হন, তাহলে আপনার অস্থিরতা বা পেরেশানী ফুটে উঠবে নামাজে। অস্থিরতা প্রমানের জন্য এর চেয়ে বেশি উপযুক্ত স্থান আর নেই বললেই চলে। দুই রাকাত নামাজ কিভাবে দেড় মিনিটে পড়া সম্ভব আমি জানি না। চার রাকাত নামাজ কিভাবে দুই মিনিটে পড়ে ফেলা হয়। ঠিক এই জায়গায়ই মানুষের অস্থিরতা প্রকাশ পায়।
যদি কেউ তারতিলের সাথে নামাজে ইমামতি করে আমার বিশ্বাস মুসল্লীরা ওই ইমাম সাহেবকে বেশিদিন মসজিদে রাখবেন না। দুই সেজদার মধ্যের দোয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট হাদিস হচ্ছে- দুই সেজদার মধ্যের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। রাসুল সাঃ নিজে দুই সেজদার মধ্যে- রাব্বিগফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়ারজুকনী, ওয়াহদীনী, ওয়াফিনী, ওয়াফু আন্নী ইত্যাদি দোয়া পড়তেন। এটা সুন্নতে রাসুল সাঃ। রাসুল সাঃ তা নিয়মিতই পড়তেন। আর নামাজে সালাম ফিরিয়ে রাসুল সাঃ মাঝে মাঝে হাত তুলে দোয়া করতেন। এটাও সুন্নতে রাসুল সাঃ। দুই সেজদার মধ্যের দোয়া নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বাড়াবাড়ি নেই, নামাজ শেষ করে যদি কেউ দোয়া না পড়ে তাকে আমরা কত বাজে ভাষায় কথা বলি। ইমাম সাহেব হলে তো এক সপ্তাহের মধ্যে বিদায়। দুই সেজদার মধ্যের যে দোয়া আছে তা শুদ্ধভাবে পড়তেই ১০/১৫ সেকেন্ডের মতো লেগে যাবে। কোনো ইমাম সাহেব যদি দুই সেজদার মধ্যে ১০/১৫ সেকেন্ড দোয়া পড়েন, তাহলে তাকে কি আর ইমামতি করতে দেয়া হবে? রুকু থেকে দাড়িয়ে একটি দোয়া পড়তে হয়। এই দোয়া পড়তেও ৮/১০ সেকেন্ড লেগে যাওয়ার কথা।
কোনো ইমাম সাহেব যদি রুকু থেকে দাড়িয়ে সেজদায় যাওয়ার আগে ৮/১০ সেকেন্ড দোয়া করেন তাহলে তার পিছনে কোনো মুসল্লী পাওয়া যাবে? হাদিস শরিফে আসছে- রাসুল সাঃ মসজিদে বসা ছিলেন। এমন সময় একজন সাহাবী মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করে রাসুল সাঃ কে সালাম দিলেন। আল্লাহর রাসুল সাঃ বললেন- তোমার নামায হয়নি, আবার গিয়ে পড়, ওই সাহাবী দ্বিতীয়বার নামাজ পড়ে রাসুল সাঃ কে সালাম দিলেন। রাসুল সাঃ বললেন- নামাজ হয়নি, আবার গিয়ে পড়।
এক পর্যায়ে সাহাবী বললেন- হে আল্লাহর রাসুল সাঃ আমি তো এর চেয়ে ভাল নামাজ পারি না। রাসুল সাঃ নিজে নামাজ শিখিয়ে দিলেন। দেখা গেল ওই সাহাবী সঠিক ভাবে রুকু সেজদা দিচ্ছিলেন না। আরও কিছু ত্র“টি ছিল। একবার রাসুল সাঃ নামাজে ইমামতি করলেন। সালাম ফিরিয়ে জানতে চাইলেন, তোমাদের মধ্যে কে রুকু থেকে দাড়িয়ে সেজদায় যাওয়ার আগে একটি দোয়া পড়েছ? রাসুল সাঃ এমনভাবে বললেন যে, সাহাবীরা মনে করলেন কোনো ভুল হয়ে গেছে। একজন সাহাবী ভয়ে ভয়ে বললেন, হে আল্লাহ রাসুল সাঃ আমি হামদান কাসিরান তাইইবান মোবারাকান ফিহা দোয়াটি পড়ছিলাম। আল্লাহর রাসুল সাঃ এরশাদ করলেন, তুমি জাননা ত্রিশ জন ফেরেশতা প্রতিযোগিতা করে আল্লাহর দরবারে তোমার জন্য জান্নাত প্রার্থনা করছে। আমরা যখন রুকুতে যাই, কার সামনে পেট পিঠ বুক নত করি? আমরা যখন সেজদায় যাই কার সামনে সরাসরি মাথা নত করি? যদি আপনার বিশ্বাস হয় আপনি স্বয়ং আল্লাহর দরবারে মাথা নত করছেন, তাহলে এই দুই জায়গায় গিয়ে আপনার মধ্যে এতো পেরেশানী বা অস্থিরতা থাকার কথা না।
বেশিরভাগ নামাজ নষ্ট হয়, রুকু এবং সেজদায়। অনেক সময় আবার দেখা যায়, ইমাম সাহেব রুকুতে যাওয়ার আগেই মুসল্লী রুকুতে চলে গেছেন, সেজদায় যাওয়ার আগেই মুসল্লী সেজদায় চলে গেছেন, সালাম ফেরানো সময় ইমাম সাহেব আসসালামু বলার সাথে সাথে মুসল্লী একেবারেই সালাম ফিরিয়ে নিয়েছেন। ইমাম সাহেব সম্পুর্ণভাবে নামাজ শেষ না করলে তো আপনার ছুটি নেই। তাহলে ইমাম সাহেবের আগে আগে যাবেন কেন? এটা খুবই নিশ্চিত, ইমাম সাহেব সর্বশেষ সালাম না ফেরানো পর্যন্ত আপনি নামাজ থেকে খারিজ হতে পারছেন না। (বিশেষ কারণ ব্যতিত)। তাহলে এইখানে আপনার পেরেশানী বা অস্থিরতা প্রদর্শনের দরকারটা কি। এখন কোনো ইমাম সাহেব যদি ফরজ নামাজ তারতিলের সাথে পড়াতে গিয়ে দীর্ঘ করে ফেলেন, তাতেও সমস্যা আছে। হাদিস হচ্ছে- ফরজ নামাজে ইমাম সাহেব ছোট ছোট আয়াত পড়বেন, কারণ তার পিছনের মুসল্লীদের কারও এমন ওজর থাকতে পারে, নামাজ বেশি দীর্ঘ করলে সমস্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে রাসুল সাঃ দীর্ঘ সময় নিয়ে ফরজ নামাজ আদায়কারী একজন সাহাবী ইমামের প্রতি রাগান্বিত হয়ে থাকিয়েছিলেন। যেমনটা তিনি সাধারণত করতেন না। বেশ কয়েক বছর আগে, হবিগঞ্জের চৌধুরী বাজার জামে মসজিদে ইমাম আল্লামা আব্দুল মজিদ সাহেব নামাজে অস্থিরতা বিষয়ে বয়ান করেছিলেন। তার সে সময়ের বয়ানটি ছিল খুব চমৎকার। তিনি কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন- মানুষ কতটা পেরেশানী বা অস্থিরতায় আছে তা বুঝা যায় ওই ব্যক্তির নামাজ দেখলে। উপরুক্ত বিষয়গুলো খুব সাধারণ, সচরাচর দেখা যায়, নিজেদের মধ্যেই পাওয়া যায়। আল্লাহ আমাদের নামাজে পেরেশানী থেকে মুক্ত রাখুন।
লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী।
০১৭১১-৭৮২২৩২
আজকের সর্বশেষ সব খবর