রবিবার | ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

হবিগঞ্জের দুঃখ গ্রাম্য দাঙ্গা : কিছু কথা

প্রকাশিত :

শিব্বির আহমদ আরজু : খোয়াই, করাঙ্গী, বিজনা, রত্না প্রভৃতি নদী বিধৌত ঐতিহাসিক এক জনপদের নাম হবিগঞ্জ। রয়েছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমা কালেঙ্গাঁর ন্যায় চিত্ত মনোহরি উদ্যান। ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে স্ব-গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ৭শ’ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ বিথঙ্গলের আখড়া ও ঐতিহাসিক সাগর দিঘি। রয়েছে মোঘল আমলের উচাইল শংকর পাশা জামে মসজিদ, পুরানবাগ জামে মসজিদসহ গ্যাসফিল্ড, চাঁ-বাগান, রাবার বাগান ইত্যাদি। ইংরেজ শাসনামলে ১৮৬৭ সালে হবিগঞ্জকে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৪ সালে ১লা মার্চ মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে হবিগঞ্জকে শিল্পাঞ্চল জোন হিসেবে অবহিত করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি গ্রাম্য দাঙ্গার কারণে সেই সমৃদ্ধ হবিগঞ্জ জেলা তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। করোনা ভাইরাস কোভিট-১৯ এর কারণে পরিপাটি সেই পৃথিবী এক মৃর্ত্যুপরীতে পরিণত হয়েছে। অচল হয়ে পড়েছে সব ব্যবসা-বাণিজ্য ও কূটনীতি। নিম্নগামি হচ্ছে অর্থনৈতিক চাকা। করোনা ভাইরাস এর কারণে যেখানে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে প্রয়োজনের বাইরে ঘর থেকে বের না হওয়া, সেখানে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হচ্ছে। কী অবলীলায় আমরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছি! করোনাকালে ১০জন আদম সন্তান প্রাণ হারিয়েছেন (সূত্র : বাংলা নিউজ২৪.কম)।  সারা জীবনের জন্য অনেকে পঙ্গুত্বও বরণ করতে যাচ্ছেন। যেসব পরিবারের সদস্য গ্রাম্য দাঙ্গায় মারা গেছেন তাদেরও একটি পরিবার আছে। আছেন মাতা-পিতাসহ স্ত্রী,পুত্র ও কন্যা। এদের কী হবে ? এদের দায়ভার কি প্রতিপক্ষ বহন করবেন ? আর প্রতিপক্ষরাও তো খুনের মামলায় জড়িয়ে নিঃস্ব হবে। আর হয়রানি এবং শাস্তি তো আছেই। এটা হচ্ছে দুনিয়ার নেজাম। আর আখিরাতে এর জন্য তাদের ভয়ানক আজাব ভোগ করতে হবে। একশ্রেণির মানুষ আজ ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে! শক্তি আছে বিধায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই হবে এমন মনোভাব পরিহার না করা পর্যন্ত এ জনপদে শান্তি আসবে না। কথায় আছে আলো যখন আসে অন্ধকার পালায়, আর অন্ধকার যখন গ্রাস করে তখন আলো অনেক দূরে অবস্থান করে। সেই অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা হবিগঞ্জবাসী অতিক্রম করছি। এক সময় খুব শান্তির জেলা ছিল হবিগঞ্জ। অটুট ছিল সাম্য ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব বন্ধন। সেটা এখনও আছে। তবে গ্রাম্য দাঙ্গায় চেপে আছে। আমাদের অর্জনগুলো সমাজে আজ উদ্ভাসিত হচ্ছে না। তথ্য প্রযুক্তির সুবাধে একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়ছে। নেতিবাচক একটি ঘটনা যেভাবে চারদিকে বিস্তৃতি ঘটে, সেভাবে ইতিবাচক বিষয়গুলো সেভাবে বিস্তৃত হয় না। সেটা মিডিয়ার দোষ নয় আমাদের চিন্তা-চেতনা ও অস্থিমজ্জার বিষয়। নেতিবাচক বিষয়ে ক্রমাগত আমরা অভ্যস্থ হয়ে পড়ছি। ফলে সমাজে হু হু করে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর আমরাও অতিমাত্রায় প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। অপরাধ দমন করা যেমন প্রশাসনের কাজ, তেমনিভাবে অপরাধ দমনে কি প্রশাসনকে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব নয়। সে দায়িত্ব কি আমরা পালন করছি ? আমি প্রশাসনের পক্ষে বলছি না, প্রশাসনের মধ্যে এমন সৎ ও দেশপ্রেমিক অফিসার আছেন যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন প্রকারের মাদক, মদ-জুয়া প্রভৃতি দমনে কাজ করছেন। আমাদের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছেন। জঙ্গিবাদ দমনে প্রায় শতভাগ সফল আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন। যেমন করোনা ভাইরাস কোভিট-১৯ থেকে দেশবাসীকে সচেতন করতে তারা নিজেরাই আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত অনেক মারাও যাচ্ছেন। সমাজে সংঘটিত অন্যায়-অপরাধ আমাদের কারও না কারও সামনেই ঘটছে। বাধা দেওয়ার শক্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা কি এর বাধা দিচ্ছি ? একটি থানায় কতজন পুলিশ সদস্য কর্মরত আছেন ? ৫০/৬০ জন। ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের বিপরীতে এত অল্প সংখ্যক পুলিশ জানমাল রক্ষায় কি যথেষ্ট ? নিশ্চয় না। ছোট ছোট বিষয়গুলো যদি পঞ্চায়েত এর সর্দার, ইউপি সদস্য এবং চেয়ারম্যান সাহেবরা সুষ্ঠু সমাধানে কার্যকরি ভূমিকা রাখতেন তাহলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে যেত। কমে যেত মামলা-মোকাদ্দমাও। আর পুলিশকে গ্রাম্য দাঙ্গা নিয়ে এত সমস্যা পোহাতে হতো না। আইন ভাঙ্গায় আমরা সদা সিদ্ধহস্ত। আর তা ছাড়া যাদের কাড়ি কাড়ি টাকা বা মামার জোর আছে তারা তো মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতেই নারাজ! এ সমাজকে অপূর্ব এক শান্তির নগরি হিসেবে গড়তে হলে এমন মনোভাব পরিহার করতে হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবেই ভাবতে হবে। দূর করতে হবে অহমিকা। সাহসী হতে হবে আমাদের। স্বীয়কে সু-নাগরিক হিসেবে ভাবতে হলে অন্যায়-অপরাধের প্রতিবাদ করতে হবে। সেটা শুরু করতে হবে তৃণমূল থেকে। সমাজের যেসব স্থানে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সেসব স্থান চিন্থিত করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনতে হবে। দয়া করে অন্তত একটিবার এ দায়িত্বটি পালন করুন। দেখবেন অপরাধীরা ভয়ে পালাবে। কথায় আছে অপরাধির মন কাঁচা। শিক্ষিত সচেতন যারা আছেন, তারা এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সহযোগিতা করুন। বাংলাদেশ পুলিশের একটি স্লোগান হচ্ছে- পুলিশই জনতা-জনতাই পুলিশ। এটি একটি চমৎকার সাড়া জাগানিয়া স্লোগান। সে স্লোগানের মর্যাদা পুলিশকেও রক্ষা করতে হবে।  আমি বিশ্বাস করি বর্তমান সুযোগ্য পুলিশ সুপার মহোদয়ের সঠিক ও সাহসী দিক নির্দেশনায় গ্রাম্য দাঙ্গা থেকে  আমরা বের হয়ে আসতে পারব ইনশা আল্লাহ।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, ‘তরঙ্গ২৪.কম’।

আজকের সর্বশেষ সব খবর